• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৪২ অপরাহ্ন |

রাজারহাটে ছিনাই ইউপিতে ত্রাণ বিতরণে চলছে দুর্নীতি

রফিকুল ইসলাম, রাজারহাট (কুড়িগ্রাম): বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণে চলছে দুর্নীতি। চলছে নানা অনিয়ম। স্বজনপ্রীতি। আর ভোট রাজনীতি। ফলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বিতরণকারীদের ঘনিষ্টরা কম ক্ষতিগ্রস্ত বা সচ্ছল হলেও এরই মধ্যে কয়েকবার ত্রাণ পেয়েছেন। অথচ সর্বস্ব হারিয়ে গত ১২ দিনে একবারও ত্রাণ পায়নি বহু দুর্গত ও অতিদুর্গত পরিবার। ফলে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটছে শত শত পরিবারের।
সীমান্ত জেলা কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বিভিন্ন দুর্গত এলাকায় মাঠ পর্যায়ে ত্রাণ বিতরণে এমন নানা দুর্নীতির অভিযোগ করেছেন বানভাসী মানুষ।
কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মোহাম্মদ ফেরদৌস খান এ প্রতিবেদককে বলেন, আমিও ত্রাণ বিতরণে কিছু অনিয়মের অভিযোগ পেয়েছি। একটার সত্যতা পেলেও বাকিগুলোর সঠিক নয়। কোন দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
আলেয়া। একজন প্রবাসী নারী। রয়েছেন বিদেশে। তার নামেই বিতরণ হয়েছে ১০ কেজি চাল (বিতরণ তালিকায় ক্রমিক নং ১৫০৪)। এই ঘটনা রাজারহাট উপজেলার স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ত্রাণ বিতরণ করা ছিনাই ইউনিয়নের। ওই ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ছিনাইহাট বড়গ্রাম পাড়ার বাসিন্দা আলেয়া। ওই ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ছোবহান আলী ওরফে ছোবহান ব্যাপারীর বিরুদ্ধে উঠে এই অভিযোগ। তার বিরুদ্ধে ত্রাণ বিতরণে স্বজনপ্রীতি, আঞ্চলিকতা এবং ভোট রাজনীতির অভিযোগও রয়েছে স্থানীয়দের। ক্ষয়ক্ষতি কম হলেও তার আপন চার ভাই আসাদুল, সোহরাব, আহাদ এবং আশরাফ ত্রাণ পেয়েছেন। এর মধ্যে দু’বার পেয়েছেন আহাদ। শুধু তাই নয়। গত ইউপি নির্বাচনে যারা তার হয়ে কাজ করেছে তারাও এরই মধ্যে কয়েকবার ত্রাণ পেয়েছে। তাদের মধ্যে দু’জন ওই ওয়ার্ডের বানিয়াপাড়ার বাসিন্দা ওমেদ আলী ও খয়রাত। অবস্থা সম্পন্ন দু’পরিবারে গিয়ে দেখা গেছে তাদের ঘরে পানি ঢুকলেও ক্ষয়ক্ষতি কম। অথচ তারা এরই মধ্যে সরকারিভাবে দেয়া ত্রাণ দু’বার পেয়েছেন। কিন্তু ওই ওয়ার্ডের বানিয়াপাড়া, কেন্দুয়াপাড়া, নাপিতপাড়া, মেকলীসহ কয়েকটি গ্রামের বহু হতদরিদ্র ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ত্রাণ পায়নি। এর মধ্যে ভাটিয়াপাড়ার শাহারা ও বানিয়াপাড়ার মল্লিকা, সিরাজুল হক, আব্দুল বাতেন, আজিরন এবং মততাসহ অনেকে। তারাসহ বেশ কয়েক নারী-পুরুষ জানান, ‘ত্রাণ নিতে গেলে গত ১৯ আগস্ট স্থানীয় ছোবহান মেম্বার বলেন, তোমরা আমাকে ভোট দাও নাই। আমি আমার লোককে ত্রাণ দেব। আমি তোমাদের ত্রাণ দেব না। এরপর থেকে আমরা যারা তাকে ভোট দিইনি তাদের অনেকেই ত্রাণ পাইনি।’
এর সত্যতা জানতে ওই মেম্বারের লোক বলে পরিচিত ওমেদ আলীর বাড়িতে গেলে তিনি বলেন, হ্যাঁ, আমি মেম্বার ও চেয়ারম্যানের লোক। আমি দু’বার সরকারি ও দু’একবার বেসরকারি ত্রাণ পেয়েছি। তবে এর আগে যখন অন্য চেয়ারম্যান ক্ষমতায় ছিল, অন্য মেম্বার দায়িত্বে ছিল তখন আমরা ৫ থেকে ৬ বছর বন্যায় কোনো ত্রাণ পাইনি। মেম্বার ও চেয়ারম্যানের অপর ঘনিষ্ট খয়রাত বলেন, আমার ঘর ভাঙ্গেনি, খড়ি ভেঙ্গেছে। ২ বার রিলিফ পেয়েছি। আমি মেম্বার চেয়ারম্যানের লোক হলেও তারা এই এলাকার সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণ করছে।
খবর নিয়ে জানা গেছে, ইউনিয়নটির ৬ নম্বর ওয়ার্ডে রয়েছে ৯৩৭টি পরিবার (২০১১ সালের আদম শুমারী অনুযায়ী)। এরমধ্যে প্রথমবার ১৫ আগস্ট ৩৪১জনকে (বিতরণের মাষ্টাররোল ক্রমিক নং-১২৯০ থেকে ১৬৩১) এবং দ্বিতীয়বার ১ হাজার ৩৯ জনকে (ক্রমিক নং ১৪৮০ থেকে ২৫১৯) ত্রাণ বিতরণ করা হয়। দু’বারে মোট ১ হাজার ৩৮০ জনকে ১০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়। অপর দিকে প্রধানমন্ত্রীর বিতরণ করা ত্রাণও ওই ওর্য়াডের অনেকে পেয়েছে। সে হিসাবে ওই ওয়ার্ডের প্রতিটি পরিবার অন্তত একবার বা তার বেশি ত্রাণ পাওয়ার কথা থাকলেও পায়নি কয়েকটি পাড়ার অনেক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারই।
এর বিষয়ে জানতে চাইলে মেম্বার ছোবহান আলী এ প্রতিবেদককে বলেন, আমার ভাইও গরীব। তাই তাকে দু’বার ত্রাণ দেয়া হয়েছে। যারা ভোট দেয়নি তাদেরকে ত্রাণ দেবনা একথা আমি বলিনি। তবে হাতে সময় কম থাকায় হয়তো তালিকায় এক নাম কয়েকবার এসেছে। আগামিবার ত্রাণের বরাদ্ধ আসলে আমি প্রতিদ্বন্দ্বি মেম্বার প্রার্থীদেরকে দেব।
এতো গেলো এক ইউপি সদস্যের কথা। স্থানীয়দের একই অভিযোগ অপর ইউপি সদস্য খালিদ হাসান খলিলসহ আরো অনেকের বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে খলিল বলেন, তালিকায় নাম থাকলেও নিতে না আসায় সে ত্রাণ অন্যজনকে দিয়ে ফেলেছি। তাছাড়া সবাই ত্রাণ পেয়েছে।
এমনকি প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ বিতরণ করা ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান হক বুলুর বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ। ছিনাই ইউনিয়নে মোট ৬ হাজার ৬৮৩ পরিবার। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ১ হাজার দুর্গতের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেন। আর দু’দফায় যথাক্রমে ২১ ও ৪০ মেট্রিক টন চালের বরাদ্ধ দেয়া হয়। তা ১০ কেজি করে ৬ হাজার জনের মধ্যে বিতরণ করা হয়। এর মধ্যে এক টন চাল রান্না করে বিতরণ করা হয়। সে হিসাবে শুধু ক্ষতিগ্রস্তরা নয়, ইউনিয়নের সব পরিবার অন্তত একবার করে ত্রাণ পাওয়ার কথা। কিন্তু বহু সর্বশান্ত পরিবার এখন একবারও ত্রাণ পায়নি।
স্থানীয় ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার খালিদ হাসান খলিল ও ইউপি চেয়াম্যান বুলুর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেন মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুল হক। তিনি বলেন, গরীব ও অতি দুর্গতদের অনেককে না দিয়ে তারা নিজেদের লোকজনকে বেছে বেছে ত্রাণ দিচ্ছে। একজনকে কয়েকবারও দিচ্ছে। এ কারণে গত ২১ আগস্ট ত্রাণ পাওয়া ও না পাওয়াদের মধ্যে গড়ের বাজারে মারামারির ঘটনাও ঘটে উল্লেখ করেন স্থানীয়রা।
ছিনাই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান হক বুলু বলেন, এমন অভিযোগ ভিত্তিহীন। যাতে অভিযোগ না উঠতে পারে সে জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছি। তবে সামান্য ত্রুটি বিচ্ছুতি হতে পারে।
রাজারহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ত্রাণ বিতরণে এমন কোনো অনিয়ম হলে আমরা ব্যবস্থা নেব। সবমিলিয়ে ছিনাই ইউনিয়নে ত্রাণ বিতরণের নামে চলছে হ-য-ব-র-ল অবস্থা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ