সিসি ডেস্ক: ভারতের আলোচিত-সমোলোচিত ধর্মীয়গুরু গুরমিত রাম রহিম সিং। প্রায় হাজার একর জমির মাঝখানে আয়নায় মোড়া তার প্রাসাদ। নাম ‘বাবা কি গুফা’। দামি আসবাব, সোফা, পর্দায় সাজানো বিলাসবহুল সেই প্রাসাদেই বাস গুরমিত রাম রহিম সিংয়ের।শ্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী
প্রধানমন্ত্রী নয়াদিল্লি
আমি পঞ্জাব থেকে আসা মেয়ে। সিরসা (হরিয়ানা)-র ডেরা সচ্চা সৌদায় একজন সাধ্বী হিসেবে সেবা করে চলেছি গত ৫ বছর ধরে । আমার মতো আরও কয়েকশো মেয়ে এখানে রয়েছেন, যাঁরা প্রতি দিন ১৮ ঘণ্টা করে সেবা করে চলেছেন।
কিন্তু এখানে আমরা যৌন নির্যাতনের শিকার। ডেরায় মেয়েদের ধর্ষণ করেন ডেরা মহারাজ (গুরমিত সিংহ)। আমি একজন স্নাতক। ডেরা মহারাজের উপরে আমার পরিবারের অন্ধ বিশ্বাস। পরিবারের সেই অন্ধবিশ্বাসের জেরেই আজ আমি একজন সাধ্বী। সাধ্বী হওয়ার বছর দুয়েক পর এক দিন রাত ১০টা নাগাদ হঠাৎ এক মহিলা ভক্ত আমার ঘরে আসেন। জানান, মহারাজ আমাকে ডেকেছেন। মহারাজ স্বয়ং ডেকে পাঠিয়েছেন শুনে খুব উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়েছিলাম। সাধ্বী হওয়ার পর সেটাই তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে তাঁর ঘরে ঢুকি। দেখলাম ওনার হাতে একটা রিমোট এবং টিভিতে তিনি ব্লু ফিল্ম দেখছেন। বিছানায় তাঁর বালিশের পাশে একটা পিস্তল রাখা ছিল। এ সব দেখে আমি ভয় পেয়ে যাই। ভীষণ নার্ভাস হয়ে পড়েছিলাম। এর পর মহারাজ টিভিটা বন্ধ করে দেন। আমাকে ঠিক তাঁর পাশে নিয়ে গিয়ে বসান। খাওয়ার জন্য এক গ্লাস জল দেন। তার পর খুব আস্তে করে বলেন, ডেকে পাঠানোর কারণ আমাকে তিনি নিজের খুব কাছের বলে মনে করেন। এটাই ছিল আমার প্রথম অভিজ্ঞতা।
১) শ্রীকৃষ্ণও ঈশ্বর। তাঁর ৩৬০ জন গোপী ছিলেন। যাঁদের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণ প্রেমলীলা করতেন। আমাকেও সবাই ঈশ্বর বলে মানে। এতে এত অবাক হওয়ার কিছু নেই।
২) আমি তোমাকে এখনই এই পিস্তল দিয়ে খুন করতে পারি। তোমার লাশ এখানেই পুঁতে দেব। তোমার পরিবারের প্রতিটা সদস্য আমার অন্ধ ভক্ত। তুমি খুব ভাল করেই জানো, তাঁরা কখনই আমার বিপক্ষে যাবেন না।
৩) সরকারের উপরেও আমার যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। পঞ্জাব, হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী এবং কেন্দ্রের অনেক মন্ত্রীও আমার কাছে আসেন। আমার প্রতি তাঁদের ভক্তি দেখান। রাজনীতিবিদরা আমার কাছ থেকে সাহায্য নিতে থাকেন। সুতরাং তাঁরাও আমার বিরুদ্ধে কোনও রকম পদক্ষেপ করবে না। আমি তোমার পরিবারের সদস্যদের সরকারি চাকরি কেড়ে নেব এবং তাঁদের সেবাদার দিয়ে খুন করাব। আর সেই খুনের কোনও প্রমাণ থাকবে না। তুমি খুব ভাল করেই জানো, ডেরা ম্যানেজার ফকিরচাঁদকেও আমি গুন্ডা দিয়ে খুন করিয়েছি। এখনও সেই খুনের কিনারা হয়নি। ডেরার দৈনিক আয় এক কোটি। এই টাকা দিয়ে আমরা রাজনীতিক নেতা, পুলিশ এমনকি বিচারক সকলকেই কিনে ফেলতে পারি।
এই সমস্ত মহিলাদের বেশিরভাগই শিক্ষিত। কারও স্নাতক তো কারও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি রয়েছে। কিন্তু তাঁরা তা সত্ত্বেও এই নরকবাস করছেন। কারণ একটাই, মহারাজের উপরে তাঁদের পরিবারের অন্ধ বিশ্বাস। আমরা সাদা পোশাক পরি, মাথায় স্কার্ফ বাঁধি, পুরুষদের দিকে চেয়ে দেখি না। পুরুষদের সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজন হলে ৫-১০ ফুট দূরত্ব বজায় রাখি। কারণ, এ সবই মহারাজের ইচ্ছা। তাঁর কথা মতোই আমরা এখানে চলাফেরা করি। সাধারণ মানুষ আমাদের দেবী গণ্য করেন। কিন্তু তাঁরা জানেন না, ডেরাতে আমরা আসলে রক্ষিতা। ডেরা এবং মহারাজের আসল সত্যিটা আমি আমার পরিবারকে জানানোর চেষ্টা করেছিলাম। তাতে তাঁরা আমাকেই বকাবকি করেন। জানান, ডেরায় স্বয়ং ঈশ্বরের (মহারাজ) বাস। সুতরাং এর থেকে ভাল জায়গা আর নেই। এবং ডেরা সম্পর্কে যেহেতু আমার মনে খারাপ ধারণা জন্মেছে, তাই আমার উচিত ‘সতগুরু’-র নাম করা। শেষ পর্যন্ত আমাকে মহারাজের সমস্ত আদেশ পালন করতেই হয়, কারণ আমি সব মিলিয়ে অসহায়।
এখানে কাউকেই অন্যদের সঙ্গে বেশি কথা বলতে দেওয়া হয় না। পাছে ডেরার সত্য ফাঁস হয়ে যায়, তাই টেলিফোনেও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেওয়া হয় না। কোনও সাধ্বী যদি মহারাজের এই আচরণ ফাঁস করে দেন, তাহলে মহারাজের আদেশ মতো তাঁকে শাস্তি দেওয়া হয়। কিছু দিন আগে, ভাতিন্দার এক তরুণী মহারাজের এই সমস্ত নির্যাতনের কথা পরিবারকে জানান। মহারাজের নির্দেশে সমস্ত সাধ্বী মিলে তাঁকে বেধড়ক পেটান। মেরুদণ্ডে গুরুতর চোট নিয়ে তিনি এখন শয্যাশায়ী। তাঁর বাবা ডেরায় কাজ করতেন। কাজে ইস্তফা দিয়ে বাড়ি ফিরে যান। মহারাজের ভয়ে এবং আত্মসম্মানের কথা ভেবে মুখ খোলেননি।
একই ভাবে মানসা, ফিরোজপুর, পাতিয়ালা এবং লুধিয়ানা থেকে এখানে আসা তরুণীরাও ভয়ে ডেরা নিয়ে কিছু জানাতে চাননি। তাঁরা ডেরা ছেড়ে চলে গিয়েছেন। কিন্তু তার পরও খুন হওয়ার ভয়ে মুখ বন্ধ করে আছেন। সিরসা, হিসার, ফতেয়াবাদ, হনুমানগড় এবং মেরঠের তরুণীরাও মুখে কুলুপ এঁটে রয়েছেন।
আমিও যদি আমার নাম জানাই, তাহলে আমাকে এবং আমার পরিবারকে খুন করা হবে। সাধারণ মানুষের স্বার্থেই এই সত্য আমি সামনে আনতে চাই। এই মানসিক চাপ আর নির্যাতন সহ্য করতে পারছি না। খুব বিপদে রয়েছি। সংবাদমাধ্যম বা সরকারি কোনও সংস্থা যদি তদন্ত চালায়, তা হলে অন্তত ৪০ থেকে ৫০ জন সাধ্বী এগিয়ে এসে এই সত্য জানাবেন আমি নিশ্চিত। আমাদের ডাক্তারি পরীক্ষা করা হোক। আমরা আদৌ সাধ্বী কি না তা জানা হোক। পরীক্ষায় যদি প্রমাণ হয় যে আমদের কুমারিত্ব নেই, তাহলে তদন্ত করে জানা হোক, কে আমাদের সতিত্ব হরণ করেছেন।
তাহলেই সত্য বাইরে আসবে। মহারাজ গুরমিত রাম রহিম সিংহই যে আমাদের জীবন নষ্ট করেছেন তার প্রমাণ মিলবে।
(২৫.০৯.২০০২ সালে ‘দেশ সেবক’ নামক পত্রিকায় এই চিঠিটা প্রকাশ পায়। মহারাজ রাম রহিমের নির্যাতন আর মেনে নিতে না পেরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে চিঠিটি লিখেছিলেন এক তরুণী সাধ্বী। সেই চিঠির খবর প্রকাশ্যে আসার পরই রাম রহিমের বিরুদ্ধে পঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে সিবিআই-কে তদন্তের নির্দেশ দেয়।)
এক দিকে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন, কখনও বলছেন ‘ফাঁসানো’ হয়েছে, কখনও জানাচ্ছেন বিচারব্যবস্থার প্রতি অগাধ আস্থার কথাও। কখনও ছাড়তে চাইছেন না আদালত কক্ষ, কখনও আবার হাতজোড় করে ক্ষমা চাইছেন। ২০ বছরের সাজা ঘোষণার পর এমনই নানান অবতারে দেখা গেল বাবা গুরমিত রাম রহিমকে। শুধু তাই নয়, জেলে পালিতকন্যা হানিপ্রীতের সঙ্গে থাকতে চান বলে ‘আজব’ আবদারও করলেন বাবা রাম রহিম।
সোমবার দুপুর ৩টে ১৫ মিনিটে রোহতক জেলের ভিতরে সিবিআই-এর বিশেষ আদালতে দু’টি ধর্ষণ মামলায় মোট ২০ বছরের সাজা শোনানো হয়েছে বাবা গুরমিতকে। দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর রাম রহিমকে গ্রেফতার করে রোহতকে নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত সব সময়ই বাবার ছায়াসঙ্গী হিসাবে হানিকে তাঁর পাশেই দেখা গিয়েছিল। সাজা ঘোষণা হওয়ার পর সেই পালিতকন্যার সঙ্গেই জেলে থাকতে চাইলেন রাম রহিম। মেয়ে হানিও বাবার সঙ্গেই রাত কাটাতে চেয়ে আবেদন করেন বিচারকদের কাছে। তবে আদালত জানায়, ধর্ষণ মামলায় সাজাপ্রাপ্ত এক আসামীর সঙ্গে একই সেলে কোনও সঙ্গী থাকতে পারেন কিনা সে সিদ্ধান্ত বিচারকরা নিতে পারেন না। সরকার বা জেল কর্তৃপক্ষ এই সিদ্ধান্ত নেবে।
পরে জেলের তরফে জানানো হয়, পুরুষদের সেলে কোনও মহিলা এভাবে থাকতে পারেন না। জেল কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্ত শোনার পর যারপরনাই ক্ষিপ্ত হয়ে যান গুরমিত। হানিকে তাঁর সঙ্গে থাকতে দেওয়া না হলে জেল আধিকারিকদের বহিষ্কার করে দেওয়ারও হুমকি দেন তিনি।
বাবা রাম রহিম দোষী সব্যস্ত হওয়ার পর থেকেই ডেরা-র পরবর্তী দাবিদার কে, তা নিয়ে শুরু হয় জল্পনা। তখন থেকেই জোরালো ভাবে উঠে আসছিল হানিপ্রীত ইনসানের নাম। ডেরা সচ্চা সৌদা-র প্রধান গুরমিত রাম রহিম সিংহের তিন মেয়ের মধ্যে অন্যতম তিনি। হানিপ্রীতের আসল নাম প্রিয়ঙ্কা তানেজা।
হিসারের ফতেহবাদের এক সাধারণ ঘরের মেয়ে প্রিয়ঙ্কা। ১৯৯৯-এ সিরসার এক ডেরা ভক্ত বিশ্বাস গুপ্তের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। সেই সময় থেকেই রাম রহিমের সঙ্গে পরিচয় এবং ঘনিষ্ঠতা। প্রিয়ঙ্কা থেকে তিনি পরিচিত হন হানিপ্রীত নামে। রাম রহিম-ই প্রিয়ঙ্কাকে ওই নাম দেন। ডেরা অনুগামীরা দাবি করেন, ‘বাবা’র কাছে শ্বশুরবাড়ির পণ নিয়ে অভিযোগ জানিয়েছিলেন হানিপ্রীত। তার পরই নাকি ২০০৯-এ হানিকে দত্তক নেন রাম রহিম। তখন থেকেই বাবা-র ছায়াসঙ্গী হানি।
সূত্র: আনন্দবাজার