ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিনিধি: আগাম কোনো ঘোষণা না দিয়েই দিনাজপুরের মধ্যপাড়া পাথর খনির পাথর উত্তোলন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড (এমজিএমসিএল)-এর কর্মকর্তা এবং ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান জিটিসির কর্মকর্তাদের মতবিরোধের পরিপ্রেক্ষিতেই পাথর উত্তোলন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেকার হয়ে পড়েছে খনির প্রায় ১ হাজার শ্রমিক।
মধ্যপাড়া পাথর খনির পাথর উত্তোলনের কাজে নিয়োজিত ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান জার্মানিয়া ট্রেষ্ট কনসোর্টিয়াম-জিটিসি আগাম কোনো ঘোষণা না দিয়েই শনিবার জরুরী বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে খনির পাথর উত্তোলন কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়।
জরুরী বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড (এমজিএমসিএল) মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) মীর মো. আব্দুল হান্নান এখন পর্যন্ত সর্বশক্তি দিয়ে খনি সংশ্লিষ্ট অপারেশনাল কাজে বাধা প্রদান করে চলেছেন। যা এমজিএমসিএল ও পেট্রোবাংলার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বহুবার অবগত করা হয়। সুতরাং এই ধরনের পরিস্থিতিতে জিটিসি এর পক্ষে খনি সংশ্লিষ্ট অপারেশনাল কাজ অব্যাহত রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
বিজ্ঞপ্তিতে আরো উল্লেখ করা হয়, মীর মো. আব্দুল হান্নানকে মধ্যপাড়া খনি সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম হতে অপসারণ না করা পর্যন্ত জিটিসি সকল প্রকার খনির কাজ হতে বিরত থাকবে এবং এই অন্তর্বর্তী কালীন সময়ে খনির সকল শ্রমিকগণকে খনির কাজে নিয়োজিত করা সম্ভব হবে না।
ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান জিটিসির মহাব্যবস্থাপক জামিল আহমেদ জানান, তারা এই খনির রক্ষণাবেক্ষণ ও পাথর উত্তোলনের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। কিন্তু খনির কর্তৃপক্ষের পক্ষে জিএম (অপারেশন) মীর মো. আব্দুল হান্নান তাদের বিভিন্ন কাজে বাধা প্রদান করে আসছেন। এর ফলে মীর মো. আব্দুল হান্নানের কারণেই তারা পাথর উত্তোলন কাজ বন্ধ রেখেছেন। মীর মো. আব্দুল হান্নানের অপসারণ না হওয়া পর্যন্ত তারা পাথর উত্তোলন বন্ধ রাখবেন বলে জানান।
এ ব্যাপারে মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) মীর মো. আব্দুল হান্নান জানান, খনির উৎপাদন বাড়াতে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে খনির উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেয়া হয় বেলারুশের প্রতিষ্ঠান জার্মানিয়া ট্রেস্ট কনসোর্টিয়াম-জিটিসি’কে। কিন্তু জিটিসি শুরু থেকেই বিভিন্ন অজুহাত শুরু করে। এক পর্যায়ের তারা ইকুইপমেন্টের অভাব দেখিয়ে ২০১৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর পাথর উত্তোলন বন্ধ করে দেয়। পরবর্তীতে তাদের প্রায় ১’শ কোটি টাকা দেয়া হয় ইকুইপমেন্ট ক্রয়ের জন্য। কিন্তু এসব ইকুইপমেন্ট খনির অভ্যন্তরে স্থাপন করা হলেও ২ বছর পরও তারা পুরোপুরি উত্তোলনে যেতে পারেনি। বর্তমানে যা উত্তোলন করছে তা আংশিক। তিনি জানান, তিনিই এই খনির সর্বেসর্বা নন। তার উপরেও অনেক কর্মকর্তা রয়েছেন। তাই তার জন্য ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান পাথর উত্তোলন বন্ধ করে দিয়েছে-জিটিসির এমন দাবীকে অযৌক্তিক ও ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করে মীর মো. আব্দুল হান্নান।
এ ব্যাপারে মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মাহমুদ খান জানান, আগাম কোনো ঘোষণা ছাড়াই কোনোক্রমেই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান জিটিসি পাথর উত্তোলন বন্ধ করতে পারেন না। জিটিসি যা করেছে-তা নিয়ম বহির্ভুতভাবেই করেছে। বিষয়টি তিনি খতিয়ে দেখছেন বলে উল্লেখ করেন।
এদিকে হঠাৎ করে পাথর উত্তোলন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেকার হয়ে পড়েছে খনির প্রায় ১ হাজার শ্রমিক।
উল্লেখ্য, দিনাজপুরের মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করে ২০০৭ সালের ২৫ মে। প্রথম অবস্থায় খনি থেকে দৈনিক ১৫ থেকে ১৮’শ টন পাথর উত্তোলন হলেও, পরে তা নেমে আসে মাত্র ৫’শ টনে। এই অবস্থায় খনির উৎপাদন বাড়াতে ২০১৪ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি খনির উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেয়া হয় বেলারুশের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান জার্মানিয়া ট্রেস্ট কনসোর্টিয়াম-জিটিসি’কে।
জিটিসি ১৭১.৮৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিময়ে ৬ বছরে ৯২ লাখ টন পাথর উত্তোলন করে দেয়ার চুক্তিবদ্ধ হয়।
এক পর্যায়ে জিটিসি মাইনিং ইকুইপমেন্টের অভাব দেখিয়ে ২০১৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে পাথর উত্তোলন পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়।
জানা গেছে, জিটিসি ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রায় ১৪৪ কোটি টাকার মাইনিং ইকুইপমেন্ট (যন্ত্রপাতি ও মেশিনপত্র) আমদানির জন্য খনি কর্তৃপক্ষকে চাপ দেয়। সে সময় যন্ত্রপাতিসহ অন্যান্য মালামালের বাজারমূল্য ও উৎপাদন ব্যবস্থাপনা নিয়ে জিটিসির সাথে খনি কর্তৃপক্ষের মতবিরোধ দেখা দেয়।
পরে খনির নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলার হস্তক্ষেপে গত ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ৮৫ কোটি টাকার মাইনিং ইকুইপমেন্ট বিদেশ থেকে আমদানীর উদ্যোগ নেয় খনি কর্তৃপক্ষ। জিটিসি’র অনুকূলে খোলা হয় ৩৬টি এলসি। বিদেশ থেকে আমদানীকৃত নতুন ও আধুনিক এসব ইকুইপমেন্ট ইতিমধ্যেই খনির ভূ-অভ্যন্তরে স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু এরপরও ২ বছরেও বাণিজ্যিকভাবে পুরোপুরি পাথর উত্তোলন করতে পারেনি জিটিসি। দৈনিক ৬ হাজার টন পাথর উত্তোলন করার কথা থাকলেও বর্তমানে দৈনিক ২ হাজার টন পাথর উত্তোলন করতে সক্ষম হয়ে জিটিসি। বেশ কয়েকবার ঘোষণা দিলেও জিটিসি পুরোপুরি উৎপাদনে যেতে পারেনি। আর এ কারণেই খনি কর্তৃপক্ষের সাথে জিটিসির মতবিরোধ বলে খনির একটি সূত্র জানায়।