
।। খুরশিদ জামান কাকন ।। সবেমাত্র সন্ধ্যা নেমেছে। একজন মোটরসাইকেল স্টার্ট দিলেন। আরেকজন হাতে বস্তা নিয়ে মোটরসাইকেলে চেপে বসলেন। গন্তব্য তাদের অজানা। উদ্দেশ্য তাদের চলমান করোনা পরিস্থিতিতে অনাহারে থাকা অভুক্ত মানুষের বাড়ি খুজে খুজে খাদ্যসামগ্রী পৌছে দেওয়া। এই কাজের ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে কোন বাছবিচার নেই। দেশের সংকটাপন্ন এই সময় পরিস্থিতির শিকার সকল শ্রেনীর মানুষের পাশেই দাড়ানোর আপ্রাণ চেস্টা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। বলছি সৈয়দপুরের একদল উদ্দ্যোমী তরুণের কথা।
সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়া মহামারি করোনা ভাইরাসের প্রকোপে থমকে গেছে জনজীবন। বিধস্ত দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। থেমে গেছে কর্মযজ্ঞ। বিরাজ করছে আতঙ্ক। জীবন কাটছে দুর্বিষহ। এরফলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে সমাজের নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেনীর মানুষ। সমাজের কর্মহীন দিনমজুর শ্রেনীর মানুষের জন্য সরকারী-বেসরকারি বিভিন্ন সাহায্য-সহযোগিতা বরাদ্দ থাকলেও নিম্ন মধ্যবিত্তদের জন্যে সুযোগ-সুবিধার ছিটেফোঁটাও নেই। এই শ্রেনীর মানুষেরা না পারে কারো কাছে সাহায্য চাইতে, আর লোকচক্ষুর ভয়ে না পারে ত্রাণের দ্বীর্ঘ লাইনে দাড়াতে।
সমাজের নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেনীর মানুষের আত্বসম্মানের কথা মাথায় রেখে দূর্যোগের এই ক্ষনে এইসকল মানুষের পাশে দাড়াতে সৈয়দপুরের ‘স্বপ্ন দিশারী’ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ভিন্নধর্মী একটি উদ্দ্যোগ নিয়েছে।তারা ফোন কলের মাধ্যমে করোনা পরিস্থিতির শিকার নিম্ন মধ্যবিত্তদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাদ্যসামগ্রী তুলে দিচ্ছে। তাদের খাদ্যসামগ্রী উপকরণের মধ্যে রয়েছে ৫ কেজি চাল, ২ কেজি আলু, ১ কেজি ডাল, ৫০০ গ্রাম পিয়াজ ও ৫০০ মিলিগ্রাম তেল। স্বপ্ন দিশারীর এই কাজে সমম্বয়কের ভূমিকা পালন করছে সৈয়দপুরের জনপ্রিয় ফেসবুক গ্রুপ ‘শিক্ষানগরী সৈয়দপুর’।
শিক্ষানগরী সৈয়দপুর গ্রুপের মাধ্যমে স্বপ্ন দিসারীর ব্যতিক্রমী এই উদ্দ্যোগ মুহূর্তেই সৈয়দপুরের মানুষের কাছে ব্যাপক সাড়া ফেলে। এরফলে প্রতিদিন শতো শতো কল আসে স্বপ্ন দিশারীর সদস্যদের কাছে। সারাদিন প্যাকেটজাত করণের কাজ করে রাতের আধারে স্বপ্ন দিশারী সংগঠনের সদস্যরা নিরবে নিভৃতে অসহায় কিছু পরিবারের পাশে ত্রাণকর্তা হিসেবে দাড়ান।
খোজ নিয়ে জানা যায়, এপ্রিলের ৬ তারিখ থেকে শুরু হওয়া স্বপ্ন দিসারীর এই কার্যক্রম করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। প্রথমদিকে স্বপ্নদিসারী সংগঠনের সদস্যরা নিজেদের অর্থায়নে ক্ষুদ্র পরিসরে তাদের এই স্বেচ্ছাসেবা কার্যক্রম পরিচালনা করলেও সময়ের সাথে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কিছু মহৎপ্রাণ মানুষ ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় স্বপ্ন দিসারীর এই কার্যক্রম বিস্তার লাভ করছে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর যাত্রা শুরু করা স্বপ্ন দিসারী সংগঠনের উদ্দ্যোগে এর আগে করোনা প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সচেতনতা মূলক লিফলেট ও জীবাণুনাশক সাবান বিতরণ করা হয়। বর্তমানে সংগঠনটির প্রায় ১৫ জন ভোলান্টিয়ারের অক্লান্ত পরিশ্রমে প্রতিদিন পঞ্চাশটিরও বেশি পরিবারের মাঝে ত্রাণ পৌঁছে দিতে সক্ষম হচ্ছে মানবতার সেবায় এগিয়ে আসা স্বপ্ন দিশারী।
স্বপ্ন দিসারী সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক খন্দকার আবিদা সুলতানা রিয়া জানান, ‘চলমান মহামারী করোনা পরিস্থিতিতে বসে নেই সৈয়দপুরের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো। সমাজের কর্মহীন দিনমজুরদের পাশে দাড়িয়েছে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। তবে আমরা স্বপ্ন দিশারীর পক্ষ থেকে চক্ষুলজ্জার ভয়ে সাহায্য চাইতে না পারা নিম্ন আয়ের মানুষগুলোর পাশে দাড়ানোর চেস্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা প্রতিটি ফোনকল পাওয়ার পরপরই যাছাইবাছাই করে খাদ্যসামগ্রী নিয়ে নির্দিষ্ট ঠিকানায় রওনা দেই এবং অত্যন্ত গোপনে সংশ্লিষ্ট বাড়ির দরজায় খাদ্যসামগ্রী রেখে দিয়ে চলে আসি।’
স্বপ্ন দিশারী সংগঠনের সভাপতি মোঃ সুমন জানান, ‘আমাদের এই উদ্দ্যোগ মূলত সৈয়দপুরের নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য। এখন পর্যন্ত আমরা সাড়ে তিনশো পরিবারের মাঝে খাদ্যসামগ্রী পৌছে দিতে পেরেছি। আমাদের এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। আমাদের কাজের সুবিধার্থে আমরা ইতিমধ্যে সৈয়দপুরের বিভিন্ন এলাকায় টিম গঠন করেছি। আমরা আর্ত-মানবতার সেবায় বৃহৎ পরিষরে স্বপ্ন দিশারীর এই কার্যক্রম ছড়িয়ে দিতে চাই সেজন্যে সবার সহযোগিতা কাম্য।’