জয়পুরহাট প্রতিনিধি ।। তথ্য গোপন করে একাধিক বিয়ে, মোহরানার অর্থ পরিশোধ না করতে স্ত্রীর সাথে চেক জালিয়াতিসহ একাধিক নারীকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে সম্ভ্রমহানিসহ নানা অপকর্মের হোতা রাজস্ব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সিআইডি’র প্রতিবেদনে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার বিনইল গ্রামের আজগর আলীর মেয়ে ও একই গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক খাইরুন নেছা’র দায়ের করা মামলার প্রেক্ষিতে সিআইডি পুলিশ পরিদর্শক সাঈদ হাসান হাফিজ গত ৩১ ডিসেম্বর জয়পুরহাট চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে এ অভিযোগপত্র দায়ের করেন।
জয়পুরহাট সিআইডি পুলিশ পরিদর্শক সাঈদ হাসান হাফিজ তার তদন্ত প্রতিবেদনে জানান, খাইরুন নেছার সাথে ২০১৪ সালের ২৫ নভেম্বর প্রথমে নোটারী পাবলিকের মাধ্যমে এফিডেভিট ও পরে ২০১৮ সালের ২৫ডিসেম্বর নিকাহ নামা রেজিষ্ট্রি মূলে ১৬ লাখ ১০১ টাকা দেন মোহরে সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার রান্ডিল-বাহাদুর গ্রামের রফিকুল ইসলামের ছেলে জুবায়ের রহমানের (৩২) বিয়ে হয়।
বিয়ের আগে ২০১২ সালে নিজ গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকুরী হলে সেই সুবাদে খাইরুন কখনো বগুড়া জেলা শহরে ভাড়া বাড়িতে আবার কখনো বাবার বাড়িতেই অবস্থান করছিলেন। এ অবস্থায় পূর্ব সম্পর্কের জের ধরে খাইরুন জুবায়েরের বিয়ে হয় ও বিয়ের পর থেকে বেকার অবস্থায় জুবায়ের ভরন-পোষন চলে খাইরুনের আয়ে।
পরে ২০১৯ সালের জানয়ারীতে রুপালী ব্যাংকে ক্যাশিয়ার পদে চাকুরী পেয়ে সিরাজগঞ্জের বেলকুচি শাখায় যোগদান করেন। ২ মাস পর জুলাই মাসে সোনালী ব্যাংকের অফিসার পদে চাকুরী পেয়ে সিরাজগঞ্জ শাখায়, ২০২০ সালের ৯জানুয়ারী জনতা ব্যাংকে সিনিয়ার অফিসার পদে নিয়োগ পেয়ে সিরাজগঞ্জের জামতৈল শাখায় এবং একই বছরের ১১ অক্টোবর সহকারি রাজস্ব কর্মকর্তা হিসাবে নিয়োগ প্রাপ্ত হয়ে সাতক্ষীরায় কাষ্টমস/এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনার এর অফিসে যোগদান করেন।
জুবায়ের বেকার থাকা অবস্থায় ও চাকুরীকালীন সময়ে স্কুল শিক্ষিকা স্ত্রী খাইরুনের সাথে দেখা-সাক্ষাত করতে নিয়মিত শ্বশুড় বাড়িতে আসতেন। এরই মধ্যে তিনি বিয়ের খবর গোপন রেখে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার জামুকি গ্রামের সারোয়ার হোসেনের মেয়ে শজিমেক এর ইর্ন্টানশীপ ডা. খাদিজাতুল কোবরা জিনিয়া নামের চিকিৎসকের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলেন।
এ অবস্থায় খাইরুনকে তালাক দেওয়ার গোপন পরিকল্পনা করেন আপন ভগ্নিপতি বগুড়র শেরপুর উপজেলার ভবানীপুর (বাজার সংলগ্ন) এলাকার কলিমুদ্দিন আকন্দের ছেলে দেলোয়ার হোসেন বকুলের সাথে। পরিকল্পনা মতে জুবায়ের ২০২০ সালের ১৮জানুয়ারী খাইরুনের বাবার বাড়ি বেড়াতে এসে খাইরুনের সোনালী ব্যাংকের (কালাই শাখা, জয়পুরহাট) স্যালারী হিসাব নম্বরের (০৭০৫১০০০৪৪০৯১) ৬টি চেক (৫৩৮৯৭৭২, ৭৬৮০৭২৫, ৭৬৮০৭৩০, ৯৫২৬৪৬৫, ৯৫২৬৪৬৪, ৯৫২৬৪৬৬,) চুরি করে ভগ্নিপতি বকুলকে দেন।
এর মধ্য থেকে ৯৫২৬৪৬৪ নং চেকটি সোনালী ব্যাংকের সিরাগঞ্জের হাটিকুমরুল শাখায় জমা দিয়ে সেখান থেকেই ওই বছর ১০ আগষ্ট ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা উত্তোলন করলে খাইরুন মোবাইল ফোনের ম্যাসেজের মাধ্যমে তা জানতে পারেন। এ ব্যাপারে ১২ আগষ্ট কালাই সোনালী ব্যাংকে গিয়ে ব্যাংক ষ্টেটমেন্ট নিয়ে জানতে পারেন ৯৫২৬৪৬৫ নং চেকে দেলোয়ার হোসেন বকুলের নাম লিখে আরো ১২লাখ টাকা ডিজওনার করা হয়েছে। পরিকল্পনা মত বকুল চেকগুলি ডিজওনার করে খাইরুনের বিরুদ্ধে সিরাজগঞ্জ আদালতে মামলা করেন। পাশাপাশি ইতোমধ্যেই জুবায়ের খাইরুনকে তালাক দেন।
এ ব্যাপারে গত বছর ১৪ আগষ্ট জয়পুরহাটের কালাই থানায় খাইরুন নেছা বাদী হয়ে দায়ের করা প্রতারনা মামলায় সিআইডি পুলিশ ৬ সেপ্টেম্বর জুবায়েরকে জনতা ব্যাংকের সিরাজগঞ্জের জামতৈল শাখা থেকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের পর সিআইডি’র জিজ্ঞাসাবাদে জুবায়ের জানান, চুরি করা অন্যান্য চেকগুলি তার ভগ্নিপতি দেলোয়ার হোসেন বকুলকে দেন।
অন্য দিকে খাইরুনের সাথে তার বিয়ের বিষয়টি গোপন রেখে জুবায়ের ২০২০ সালের ৩ আগষ্ট গোপনে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার জামুকি গ্রামের সারোয়ার হোসেনের মেয়ে ডা. খাদিজাতুল কোবরা জিনিয়া নামের ইর্ন্টান চিকিৎসককে বিয়ে করে। তবে জুবায়েরের বিয়ে ও বিভিন্ন প্রতারনার বিষয়টি জানতে পেরে একই বছর ৭ অক্টোবর ডা. খাদিজাতুল কোবরা জিনিয়া জুবায়েরকে তালাক দেন।
সিআইডি কর্মকর্তা তার প্রতিবেদনে আরো জানান “এছাড়াও অভিযুক্ত জুবায়েরের বিরুদ্ধে এলাকায় নারীঘটিত বদনাম থাকার তথ্য পাওয়া গিয়েছে। তবে প্রতারিত মহিলা ও মেয়েরা সামাজিক মান-সম্মানের ভয়ে আইনের আশ্রয় গ্রহন না করায় তাহার এইরুপ অপরাধ প্রবনতার মাত্রা বৃদ্ধি পাইয়াছে।”
খাইরুন নেছা ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘ দীর্ঘ সময় চেনা জানার পরও চিনতে পারিনি জুবায়ের এত বড় একজন প্রতারক। আমার মোহরানার টাকা যাতে দেওয়া না লাগে সে জন্য এত বড় প্রতারনা করেছে। এমন প্রতারকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়ার পাশাপাশি আমার ও আমার বাবার কষ্টার্জিত টাকাগুলো যেন ফেরত পাই, এই আবেদন করছি।
এ ব্যাপারে অভিযুক্ত জুবায়ের রহমানের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
বিষয়টি বাদীনী পক্ষের আইনজীবি এ্যাভোকেট মানিক হোসেন জানান, “ আমার মক্কেলের সাথে অভিনব কায়দায় প্রতারনা করেও জুবায়ের পার পাবে না, আমরা ন্যায় বিচার পাব বলে আশা করছি।”