• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:১৮ অপরাহ্ন |

বাদল মাষ্টারের গরু-ছাগলের খামার বেকার যুবকদের দিক নিদের্শনা

জয়পুরহাট প্রতিনিধি ।। জয়পুরহাট সদর উপজেলার মঙ্গলবাড়ি এলাকার জাহানপুর উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারি প্রধান শিক্ষক আবু বক্কর সিদ্দিক ওরফে বাদল মাষ্টার শিক্ষকতা পেশায় সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি তিনি। শিক্ষকতা পেশার পাশাপাশি মেয়ে জামাইয়ের সহযোগীতায় গরু-ছাগল পালন করে বানিজ্যিক মুনাফার আশা করছেন, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের কাছে ব্যবহারিক পাঠ দানের ক্ষেত্র করে গড়ে তুলেছেন। এতে চাকুরীর দূমূর্ল্যরে এই বাজারে বেকার তরুণদের কাছে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার প্রশিক্ষনের পাশাপাশি নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরীর মডেল হতে চলেছে বাদল মাষ্টারের এই গরু-ছাগলের খামার।

সরেজমিনে জানা গেছে, জয়পুরহাট জেলা শহর থেকে মাত্র ৭ কিলোমটিার পশ্চিমে ও নওগাঁ জেলা শহর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত নওগাঁর জাহানপুর গ্রামের বাসিন্দা ও একই গ্রামের ঐতিহ্যবাহি উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারি প্রধান শিক্ষক আবু বক্কর সিদ্দিক, যিনি এলাকায় বাদল মাষ্টার নামে সুপরিচিত। শিক্ষকতার পাশাপাশি নিজ বাড়িতে গত বছর নভেম্বর মাসে ২টি এঁড়ে গরু নিয়ে খামার করার যাত্রা শুরু করেন তিনি।

বাদল মাষ্টার বলেন, তার মেয়ে-জামাই তরুন উদ্যোক্তা আব্দুল গাইয়ূম মোঃ হাদী’র সহযোগীতায় ধীরে ধীরে বিভিন্ন জাতের ও উন্নত প্রজাতির ৪১টি স্বাস্থ্যবান এঁড়ে ও বলদ গরু নিয়ে তারা শুরু করেছেন বানিজ্যিক ভিত্তিক খামার। এর মধ্যে ২০টি শাহী ওয়াল, ১২টি বলদ, ৪টি সিন্ধি, ২টি অষ্ট্রেলিয়ান বা ফ্রিজিয়ান, ২টি নেপালী ও ১টি বাহামা জাতের গরু রয়েছে। এ ছাড়াও শ্বশুর-জামাইয়ের এই খামারে রয়েছে আরো ৬টি উন্নত জাতের এঁড়ে বাছুর ও ১০টি উন্নত জাতের ছাগল।

গরু ও ছাগলের গোবর থেকে মূল্যবান কেঁেচা সার ও বায়ো গ্যাস উৎপাদনের উদ্যোগও গ্রহন করা হয়েছে জানিয়ে বাদল মাষ্টার বলেন, বায়োগ্যাস দিয়ে অন্ততঃ নিজের ও প্রতিবেশীদের জ্বালানী চাহিদা পূরন করা সম্ভব, আর কেঁচো সারের রয়েছে বেশ কদর।

বিশুদ্ধ পদ্ধতি অবলম্বন করে সম্পূর্ন প্রাকৃতিক নিয়মে ও দেশীয় খাদ্য দিয়ে মোটা-তাজা করনসহ একই পদ্ধতিতে ছাগলের খামারও শুরু করেছেন তারা। খামারের পরিধি বৃদ্ধি করার পাশাপাশি আরো কর্ম সৃষ্টির আশাও রয়েছে বলেও জানান, এই খ্যাতিমান শিক্ষক ও তার মেয়ে জামাই।

একই গ্রামের হুমায়ন সিং বলেন, ‘ হাঁড়া পুরা বছরের মধ্যে গড়-পরতাই ৫/৬ মাস মানস্যের জমিত কামলা দেই, আর বাঁকী সমায় বসেই থাকে খায়া না খায়া দিনপদ যাছল, একন বাদল মাষ্টারের গরু-ছাগলের খামারত হাঁড়া ভর বছরই কাম পাছি।

খামারের কর্মচারী আবু তালেব ও শাহিন সরদারসহ এলাকাবাসী জানান, বাদল মাষ্টারের এই থামারে বর্তমানে ৭/৮ জন কর্মচারী গরু-ছাগলের পরিচর্যার কাজে নিয়োজিত অছেন। এই খামারে এখন কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন প্রায় এক ডজন যুবক এই কর্মচারীদের প্রত্যেকে ৮ থেকে ১০হাজার টাকা পর্যন্ত মাসিক পারিশ্রমিকে কাজ করে থাকেন বলে তারা জানান।

এ ছাড়া আশ পাশের কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যবহারিক পাঠদান ও ফিল্ড ট্রিপের ব্যবস্থাও হয়ে থাকে এই খামারে বলে মন্তব্য করেছে স্থানীয় শিক্ষার্থীর। জাহানপুর উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রতন কুমার, রাজন সিং ও উজ্জল পাহানসহ অন্যান্য শিক্ষার্থীরা জানায়, তারা শিক্ষকদের পাঠ উপস্থাপন শেষে ব্যবহারিক শিক্ষা নিতে প্রায়ই এই খামারে ফিল্ড ট্রিপে এসে হাতে কলমেও শিক্ষা গ্রহন করে বেশ উপকৃত হচ্ছে।

নিজ গ্রামে থেকেই রেজগারের পথ খুঁজতে খামারটিতে প্রতি দিনই আছেন বিভিন্ন এলাকা থেকে শিক্ষিত বেকার যুবকসহ অনেকেই। এই খামার দেখে গরু-ছাগল পালনে আগ্রহও প্রকাশ করেন তারা। চাাঁপাই নবাবগঞ্জের ভোলারহাট থেকে ফজলুর রহমান, রুবেল হোসেন, জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার কাদিরপুর গ্রামের শাব্বির আহম্মেদসহ এই খামার দেখতে আসা অনেকে বলেন, বাদল মাষ্টার বিনা পারিশ্রমিকে অকৃপন ভাবে গরু পালনের নিয়মগুলিও সহজ করে বুঝিয়ে দেন, সে ভাবে অনেকেই উপকার পাচ্ছেন বলেও জানান দর্শনার্থীরা।

বাদল মাষ্টারের জামাই আব্দুল গাইয়ূম হাদি জানান, খামারটি নওগাঁ জেলার মধ্যে হলেও সেখান থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার, কিন্তু জয়পুরহাট জেলা শহর থেকে মাত্র ৭/৮ কিলোমিটার দূরত্বে হওয়াই তারা জয়পুরহাট প্রাণি সম্পদ বিভাগের সহযোগীতা নিয়ে গরু-ছাগল পালন করছেন।

গরু পালন ও বানিজ্যিক ঝুঁকির ব্যাপারে হাদি বলেন, ‘ প্রাণি সম্পদ বিভাগের তথ্য মতে, দেশে গো-মাংশের চাহিদা অনুযায়ী প্রতি বছর চাহিদা রয়েছে ২ কোটি ৭৬ লাখ গরু, এর অধিকাংশই এঁড়ে বা বদল। আর চাহিদার বিপরীতে ১ কোটি ২ লাখ গরু ঘাটতি থাকলেও খামারীরা অনেক সময়ই লোকসান করেন, এর প্রধান কারন গো-খাদ্যের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি ও গরুর বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌড়াত্ব।”

তিনি বলেন, মন প্রতি ভূট্টা ৯১০ টাকা, গমের ভূষি ১,২০০ টাকা, সোয়াবিন ভূষি ২,৪০০ টাকা, খুদ ১,৫২০ টাকা, প্রতি আটি খড় সাড়ে ৬ টাকা ও ঘাষ ১০ টাকা, ব্যাংক ঋণের বিপরীতে ১১% সুদসহ আনুষঙ্গিক খরচ। এসব খাদ্য, শ্রমিকদের মজুরী, বিদ্যুৎ বিল ও অন্যান্য খরচসহ বিদেশী গরু প্রতি প্রতি মাসে ১০/১১ হাজার টাকা খরচ পরে, আর দেশী গরুতে খরচ হয় এর অর্ধেকেরও কম।

গো-খাদ্যের দাম কমানো না গেলেও গরুর বাজারগুলোতে মধ্যস্বভোগীদের দৌড়াত্ব কমানো হলে একদিকে খামার মালিকসহ গৃহস্থ বা দরিদ্র গরু-ছাগল পালনকারীরা লাভবান হবেন, অন্যদিকে মাংশ ক্রেতাদের নাগালের মধ্যেই থাকবে ক্রয় ক্ষমতা বলে মন্তব্য করেন তরুন উদ্যোক্তা হাদি।

শ্বশুর বাদল মাষ্টার ও মেয়ে জামাই হাদি’র দেওয়া তথ্য নিশ্চিত করে জয়পুরহাট সদর উপজেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা মামুনুর রশিদ জানান, “খামারটি নওগাঁ জেলার মধ্যে হলেও সেখান থেকে অনেক বেশী দূরত্ব ও জয়পুরহাট থেকে অনেক কম দূরত্বে হওয়ার কারনে তারা সহযোগীতা চাইলে রাষ্ট্রীয় প্রাণী সম্পদের উন্নয়ন কথা ভেবে আমরা সহযোহীতা দিয়ে যাচ্ছি।”


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ