।। রেজা মাহমুদ ।। এক সময় গরুর হাল ছাড়া কৃষকের জমি প্রস্তুতের কথা চিন্তাই করা যেত না। এতে পেশাদার হালুয়ারা (হাল মালিক) সকালে উঠে হাতে নিতেন দুই গরু। আর ঘাড়ে লাঙ্গল-মই ও জোয়াল নিয়ে ছুটে যেতেন মাঠে। দুই গরুর ঘাড়ে জোয়াল এর মাঝখানে দিতেন লাঙ্গলের লম্বা ইঁশ। হালুয়ার ইশারায় চলতো গরুগুলো।
বাংলার এ অতীত ঐতিহ্যের চিত্র এখনো দেখা যায় নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলায়। অত্যাধুনিক যুগেও এখনো এ উপজেলায় বেশ কিছু এলাকায় লাঙল-গরু দিয়ে হালচাষ করে বলে জানিয়েছেন অনেক কৃষক। তাঁরা বলেন, গরুর হাল দিয়ে নিজের জমি চাষ করে এবং জীবিকা নির্বাহে অন্যের জমি চাষ করে।
শহরের ইসলাম বাগ এলাকার এলাকার পেশাদার হাল মালিক (হালুয়া) আসাদুজ্জামান মিয়া বলেন, এক সময় অন্যের জমিতে হাল চাষ করে পরিবারের ভরণ-পোষন করতেন। পূর্বপুরুষের এই পেশা ছাড়েননি তিনি। এখন তিনি নিজের জমিতে হাল চাষ করেন।
গোলাহাট পশ্চিমপাড়া এলাকার পেশাদার হালচাষী খাদেমুল ইসলাম মণ্ডল জানান, প্রায় ৩০ বছর ধরে হাল চাষ করি। বর্তমানে আমার দু’জোড়া হালের গরু আছে। প্রতিদিন প্রায় ৩-৪ বিঘা অন্যের জমি হাল চাষ করি। এতে ভালোয় আয় হয়।
কামারপুকুর ইউনিয়নের ধলাগাছ গ্রামের আকতার হোসেন বলেন, আমার বেশ কিছু ছোট ছোট উঁচু-নিচু জমি আছে। এ জমিগুলো চাষ কখনো পাওয়ার ট্রলি দিয়ে সম্ভব হয় না। তাই এসব জমি চাষে এখনো লাঙলের হাল ব্যবহার করা হয়। প্রতি বিঘা জমি চাষে খরচ হয় ৪০০ টাকা।
সৈয়দপুর উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, প্রায় ৪৫ হেক্টর জমিতে লাঙল-গরু দিয়ে হাল চাষ করা হয়। আর এসব জমি চাষ করেন প্রায় ১৩৫জন হালচাষী ।
সরেজমিন উপজেলার কাশিরাম বেলপুকুর ইউনিয়নে ডাঙ্গাপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, লাঙ্গল-গরু দিয়ে জমি চাষ বেশ কয়েকজন হালুয়া। দিনভর চাষ শেষে কাদা সমান করতে তাঁরা ব্যবহার করছেন মই। জোয়ালের দুই পাশে দুটি লম্বা রশি লাগানো মইয়ের সঙ্গে। এই মইয়ের মাঝখানে হালুয়ারা। তাদের ইঙ্গিতে চলছে গরু, সমান হচ্ছে জমি।
নাজমুল হোসেন নামের এক হালুয়া বলেন, এ এলাকার জমি বেশ উঁচু নিচুঁ তাই ট্রাক্টর দিয়ে চাষ করা যায় না। তাছাড়া বাংলার অতীত ঐতিহ্য ধরে রাখতেই তারা বাপ-দাদার এ পেশা এখনো ছাড়েননি।
সৈয়দপুর উপজেলা কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা শাহিনা বেগম বলেন, লাঙলের হাল দিয়ে জমি চাষে অনেক সময় অর্থ ব্যয় হয় কৃষকের। তাই দিন দিন এ পদ্ধতি হ্রাস পাচ্ছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে কমছে কৃষি জমি। এক সময়ের কৃষকের সঙ্গী লাঙল, জোয়াল ও মই এসব হয়তো এক সময় চির বিশ্রামে গিয়ে জাদুঘরে স্থান পাবে। আর পরবর্তী প্রজন্মের জন্য বাংলার কৃষি যুগের গৌরব মনে করিয়ে দেবে।