• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:২৬ অপরাহ্ন |

বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বিজড়িত নীলফামারীর শেখ জামে মসজিদ

।। এস এম জামান ।। দিনটি ছিল ১৯৬৯ সালের ২৩ অক্টোবর শুক্রবার। আইয়ুব খান বিরোধী আন্দোলনের প্রচারণায় অংশ নিতে ঢাকা থেকে মাইক্রোবাস যোগে নীলফামারী আসছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। এ সময় নীলফামারী-সৈয়দপুর সড়কের কোল ঘেঁষে চৌচালা খড়ের তৈরী নতুন একটি মসজিদে তিনি সফরসঙ্গীদের নিয়ে জুম্মার নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে মুসল্লীরা তাৎক্ষনিক আলোচনায় মসজিদের নামকরণ করেন ‘শেখ জামে মসজিদ’।
জেলা সড়কের পাশেই নীলফামারী সদরের চড়াইখোলা ইউনিয়নের পশ্চিম কুচিয়ার মোড়। এ মোড়ের ফকিরপাড়ার সত্তরোর্ধ বয়সের বাসিন্দা ও বর্তমান ইউপি সদস্য শহিদুল শেখ বলেন, আইয়ুব খান বিরোধী আন্দোলনের প্রচারণায় অংশ নিতে তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান নীলফামারী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এসেছিলেন। জুম্মার নামাজের সময় গাড়ি থেকে নেমে বঙ্গবন্ধু চৌচালা কুঁড়েঘরের নতুন এই মসজিদে নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে বঙ্গবন্ধু আমার চাচা উমর শেখের হাতে ৫০০ টাকা দিয়ে বলেন, আমার জন্য দোয়া করবেন, আমার দল ক্ষমতায় এলে পাকা মসজিদ বানিয়ে দেবো। এরপরই মসজিদটির নাম রাখা হয় শেখ জামে মসজিদ।
ওই গ্রামের বয়োজৈষ্ঠ্য বাসিন্দা ওসমান গনি টুনু করে বলেন, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে এক কাতারে নামাজ আদায় করতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করেছি। নামাজ শেষে তিনি সবার সঙ্গে হাত মেলান ও মোলাকাত করে মসজিদের উদ্বোধন ঘোষণা করেন। সে সময় বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, তিনি যদি আন্দোলনে সফল হয়ে ভোটে জয়ী হতে পারেন তাহলে মসজিদটি পাকা করে দেবেন।
তিনি জানান, সেদিন বঙ্গবন্ধুর সফরসঙ্গী ছিলেন এম মনসুর আলী, তাজ উদ্দিন আহমেদ, এ এইচ এম কামরুজ্জামান ও নীলফামারী সৈয়দপুরের ডা. জিকরুল হক, মো. আলিম উদ্দিন, জেলা শহরের আফসার আলী, ডোমার উপজেলার আব্দুর রব, জলঢাকা উপজেলার আমিন বিএসসি, আজাহারুল হক।
মোড়ের চা দোকানদার আব্দুল হামিদ বলেন, ঠিক নামাজের সময় হঠাৎ পাঁচ-সাতটি কার এসে থামায় মসজিদের কাছে। বেশ কয়েকজন লোক তড়িঘড়ি করে ওজু করে নামাজে শরিক হয়ে যান। নামাজ শেষে সবার উদ্দেশে তিনি পরিচয় দিয়ে বলেন, আমি শেখ মুজিবুর রহমান। আমরা মুসল্লিরা সবাই হতবাক হয়ে গেলাম।
শেখ জামে মসজিদ কমিটির সভাপতি আব্দুস সাত্তার ভুট্টু জানান, ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতি হলে মসজিদ কমিটির লোকজন যোগাযোগ করেন। সেসময় বঙ্গবন্ধু মসজিদ সংস্কারের জন্য ২৫ হাজার টাকা প্রদান করেন। সেই টাকা দিয়ে মসজিদ কমিটি প্রথম ধাপে ইট সিমেন্ট দিয়ে ২৪ হাত দৈর্ঘ্য ও ১৬ হাত প্রস্থের একটি পাকা টিনশেড মসজিদ ঘর নির্মাণ করা হয়। এরপর বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার অনুদানে এখন মডেল মসজিদে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বিজড়িত এ মসজিদের নির্মাণ কাজ এখনও শেষ হয়নি। মুসল্লি সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় নামাজের জায়গা সংকুলান হয়ে পড়েছে। বিষয়টি নিরসনে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন।
বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নীলফামারী জেলা কমিটির সভাপতি মনিরুল হাসান শাহ আপেল এ বিষয়ে জানান, পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বিজড়িত শেখ জামে মসজিদের ব্যাপক উন্নয়ণের প্রয়োজন। যেহেতু জেলা সড়কের পাশেই মসজিদের অবস্থান, তাই ওই সড়কে চলাচলকারী দেশী-বিদেশী মানুষের কাছে এটি একটি দর্শনীয় স্থান হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
নীলফামারী জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক অ্যাডভোকেট মমতাজুল হক জানান, ২০১৪ সালে জেলা পরিষদের অর্থায়নে ৭১ লাখ টাকা ব্যয়ে শেখ জামে মসজিদটি মডেল মসজিদ করা হয়। বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া শেখ জামে মসজিদটি এখন এলাকার বাইরেও দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্মপ্রাণ মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
নীলফামারী জেলা প্রশাসক মো. হাফিজুর রহমান চৌধুরী জানান, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের উদ্যোগে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বিজড়িত স্থানগুলো সংরক্ষনের তালিকায় রয়েছে শেখ জামে মসজিদ। ইতিমধ্যে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজকে সাথে নিয়ে মসজিদ পরিদর্শন করা হয়েছে। শীঘ্রই বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বিজড়িত এ মসজিদের কাজ শুরু হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ