• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৫৬ অপরাহ্ন |

মরণের আগে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি চান আজিজারের পরিবার

জয়পুরহাট প্রতিনিধি ।। ৫২’এর ভাষা আন্দোলনে জয়পুরহাটে যে ক’জন গুরুত্বপূর্ন অবদান রেখেছিলেন তাদেরই মধ্যে ভাষা সংগ্রামী ডাঃ আজিজার রহমান। ভাষা সংগ্রামের ৭০ বছর পার হলেও ভাষা সংগ্রামে যাওয়ার উদ্দেশ্য আজো পুরণ ও মূল্যায়ন হয়নি এতোগুলো বছরেও।
সরকারি-বেসরকারী কোন প্রতিষ্ঠানই নেয়নি তাদের কোন খোঁজ খবর। ভাষার জন্য তারা যে ত্যাগ শিকার করেছেন সেই ভাষার বর্তমান হাল দেখে বেশ হতাশ তিনি। বাংলার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকারি উদ্যোগ নেয়ার আহবানও জানান এই ভাষা সৈনিক।
জয়পুরহাট জেলায় যে কয়জন ভাষাসৈনিক ছিলেন তার মধ্যে বর্তমানে জীবিত আছেন আজিজার রহমান। বর্তমানে ৯৪ বছর বয়সে তিনি বার্ধক্যের কারনে ঠিকমত কথা বলতে ও চলাফেরা করতে পারেন না। বর্তমানে নিজ বাসায় অসুস্থ্য হয়ে পড়ে আছেন।
প্রতি বছর ফেব্রুয়ারী মাস আসলে অনেকেই খোঁজ-খবর নিলেও বাকী সময় তিনি থাকেন নীরবে-নিভৃতে। শেষ বয়সে এসে তার পরিবার চান রাষ্ট্রীয়ভাবে তাকে স্বীকৃতি দেওয়া হোক।
মোঃ আজিজার রহমান ১৯২৮ সালের মার্চ মাসের ৪ তারিখে নওগা জেলার বদলগাছী উপজেলার ঝারঘড়িয়া গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। বর্তমানে জয়পুরহাট জেলার ক্ষেতলাল উপজেলার মহব্বতপুর গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন।
তিনি ছোটবেলায় প্রাইমারী স্কুল পাশ করে ১৯৪৮ সালে আক্কেলপুর হাইস্কুলে ভর্তি হন। সেখানে তিনি নবম শ্রেনী পর্যন্ত পড়ালেখা করার সময় দেশের জন্য রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারী ঢাকায় ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে ২২ ফেব্রুয়ারী দেশের অন্যান্য স্থানের মত আক্কেলপুরে ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে অনেকের সাথে তিনিও নেতৃত্ব দেন।
৬ দফা আন্দোলন, ১১ দফা আন্দোলন, অসহযোগ, ৬৯ এর গণঅভ্যুথ্ান, ১৯৭০ এর নির্বাচন, ৭১ সালে তিনি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নেন। ১৯৭১ সালে তিনি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য ভারতে যান। সেখানে আসাম রাজ্যের তেজপুর ক্যাম্পে প্রশিক্ষন গ্রহন করেন। পরবর্তীতে তিনি মুক্তিযুদ্ধেও একনিষ্ঠ সংগঠক হিসাবে কাজ করেন। ২০০০ সালের ৭ অক্টোবর প্রকাশিত মুক্তিবার্তায় তার নাম উল্লেখ আছে। তার মুক্তিবার্তা নং-০৩০৫০৪০৩৮৫।
ব্যাক্তিগত জীবনে ডাঃ আজিজার ছিলেন সৎ, নির্লোভ ও দেশ প্রেমিক ও ত্যাগী রাজনীতিবিদ। এজন্য জীবনে ২ বার কারাবরণ করেন। তিনি আক্কেলপুর আর্দশ ক্লাব ও পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করেন। ব্যক্তিগত জীবনে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক ছিলেন। তাই এলাকায় তাকে সবাই আজিজার ডাক্তার নামেই চিনেন। তিনি ২ ছেলে ও ১ মেয়ের জনক। তিনিসহ তার স্ত্রী একাই বসবাস করেন নিজ বাড়ী মহব্বতপুরে।
ভাঙ্গা ভাঙ্গা কন্ঠে ভাষা সৈনিক ডাঃ আজিজার রহমান বলেন, বাংলা ভাষা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলেও এর যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না এখনো। অপ-সংস্কৃতির কবলে পড়ে হারিয়ে যেতে চলেছে বাংলা ভাষার গৌরব। দেশ স্বাধীনতা লাভ করলেও তার মতে এখনো অর্থনৈতিক স্বাধীনতা লাভ করা সম্ভব হয়নি। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ভাষা সৈনিক হিসাবে স্থানীয় কিছু সম্মাননা মিললেও জাতীয়ভাবে কোন স্বীকৃতি মেলেনি। এজন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
ভাষা সৈনিক ডাঃ আজিজার রহমানের ছেলে উজ্জল হোসেন ও কন্যা রীতা আক্তার বলেন, প্রতিবছর ফেব্রুয়ারী মাস আসলে অনেক সংগঠন ও সরকারের অনেক দপ্তর তাঁর খোঁজ নিলেও অন্য সময়ে কেউ তাঁর খোজ নেন না। ৯৪ বছর বয়সের সদালাপী আর হাস্যোজ্জল মহব্বতপুর গ্রামের ভাষা সংগ্রামী ডাঃ আজিজার রহমান হোমিও ডাক্তারি করতেন।
৫২’এর ভাষা আন্দোলনের সময় মাতৃ ভাষার প্রতি পাকিস্তানীদের আঘাত আর বাংলা ভাষার প্রতি অকৃত্রিম মমত্ব বোধ থেকেই তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন ভাষা আন্দোলনে। অনেক প্রত্যাশা আর উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি ভাষা সংগ্রামে যোগ দিয়েছিলেন, কিন্তু তার প্রাপ্তির ঝুলি এখনও অনেকটাই শূন্য। শুধু ভাষা আন্দোলন নয়, ৭১ এর মুক্তিযোদ্ধা আর মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠকও ছিলেন। আমার বাবা যেন জীবদ্দশায় ভাষা সৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে স্বীকৃতি পায় এমন দাবী আমাদের পরিবারের।
এ ব্যাপারে জয়পুরহাট জেলা প্রশাসক শরীফুল ইসলাম জানান, ব্যাপারটি আমি শুনলাম, খোঁজ-খবর নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে ভাষা সৈনিক আজিজারের যথাযথ মর্যাদা দেওয়া হবে।
গুনী এই ভাষাসৈনিক আজিজার রহমান বিভিন্ন ক্লাব ও সংগঠন থেকে একাধিক পদক ও সন্মাননা পেলেও তার এই জীবন সায়াহ্নে যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি পেতেন তাহলে তিনি হয়তো মরনের আগে শেষ আনন্দটা উপভোগ করতে পারতেন। এ ব্যাপারে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। মহান ভাষা আন্দোলনের এই বীর সৈনিকদের পড়ন্ত বেলায় হলেও যথাযথ মর্যাদা দেওয়া হোক এমনই দাবি এলাকাবাসির।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ