• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:২৩ অপরাহ্ন |

ঘোড়াঘাটের সুরা মসজিদ এখন অস্তিত্ব-সংকটে

ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর) প্রতিনিধি ।। দেশের আনাচে কানাচে অনেক স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য ঐতিহাসিক স্থাপনা। বিরল এইসব স্থাপনা সঠিক দেখভালের অভাবে অস্তিত্ব-সংকটসহ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এমনি এক স্থাপনা দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার টেরাকোটা অলংকরণ ও পোড়া মাটির চিত্রফলকের অনন্য নিদর্শন সুরা মসজিদ। এই মসজিদের নির্মাণ শৈলী ও নামকরণ নিয়ে রয়েছে বিভিন্ন মতামত ও বর্ণাঢ্য ইতিহাস।
দেশের উত্তরের জেলা দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে মসজিদটি অবস্থিত। প্রাচীন স্থাপত্যের সাক্ষী এ মসজিদটি প্রায় সাড়ে ৫০০ বছর আগে নির্মিত। ঘোড়াঘাট উপজেলা পরিষদ চত্বর থেকে তিন কিলোমিটার পশ্চিমে ৪নং ঘোড়াঘাট ইউনিয়নের চৌগাছা মৌজার হিলি-ঘোড়াঘাট পাকা সড়ক সংলগ্ন উত্তর ধারে ৩৫০-২০০ গজ আয়তন বিশিষ্ট বিশাল পাড়ওয়ালা দিঘির ধারে এই মসজিদটি অবস্থিত।
এলাকার লোকজন মসজিদটিকে বিভিন্ন নামে ডাকেন। মসজিদের নির্মাণ নিয়ে প্রচলিত আছে বিভিন্ন কথা। কেউ কেউ একে বলেন সৌর মসজিদ, কেউ বলেন সুরা মসজিদ, আবার কেউ বলেন শাহ সুজা মসজিদ।
সুর শব্দের অর্থ হলো অপদেবতা বা জ্বীন। স্থানীয়দের মতে এক রাতের মধ্যে জিনেরা এই মসজিদটি নির্মাণ করেছিল; তাই এর নাম হয়েছে সুরা মসজিদ। আর সৌর শব্দের অর্থ আসমানী বা গায়েবী; অর্থাৎ লোক চক্ষুর আড়ালে যা ঘটেছে তাই হল গায়েবী। তাই কেউ কেউ এই মসজিদ কে সৌর মসজিদ বলেন কারণ তাদের ধারণা গায়েবীভাবে এই মসজিদটি তৈরি হয়েছিল। আবার এলাকার মুরুব্বীরা এটাও বলেন যে মুঘল আমলে বাংলার নবাব শাহ সুজা এই মসজিদ নির্মাণ করেন, তাই তারা একে শাহ সুজা মসজিদ বলে ডাকেন। তবে মসজিদের নির্মাণ ও গঠনশৈলী দেখে ধারণা করা যায় যে স¤্রাট শাহ সুজার ক্ষমতা গ্রহণের অনেক আগে এটি নির্মিত হয়েছে। আর যেহেতু এই মসজিদটি কোন শিলালিপি নেই তাই গঠনশৈলীর উপর ভিত্তি করেই সম্ভাব্য নির্মাণকাল বের করা হয়।
তবে বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, স্থাপত্যশৈলী ও নির্মাণ কলাকৌশল পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ধারণা করা যায় বাংলা নবাব হোসেন শাহী আমলের নিদর্শন এটি। তাছাড়া ইতিহাসবিদ অধ্যাপক দানী একে গৌড়ের সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আমলে নির্মিত বলে অনুমান করেন। আবার কারো কারো মতে এটি সুলতানি আমলে ১৪৯৩ থেকে ১৫১৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে নির্মিত।
মসজিটি পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা। ৪ ফুট উঁচু প্লাটফর্মের উপর এর কাঠামো গড়ে উঠেছে এর বাইরের ১২ দশমিক ১২ মিটার এবং প্রধান কক্ষের ভেতরের আয়তন ৪ দশমিক ৮৪ মিটার। মসজিদের প্রধান কামরায় ৪ কোণে ও বারান্দার ২ কোণে বাইরের দিকে একটি করে মিনার আছে। এগুলো কালো পাথরের তৈরি। প্রধান কামরার ও বারান্দার পূর্ব দেয়ালে ৩টি করে প্রবেশদ্বার আছে। প্রধান কক্ষের ওপরে একটি গম্বুজ আছে। বারান্দার ওপরে ৩টি ছোট গম্বুজ আছে। সম্মুখভাগে রয়েছে একটি বারান্দা। মসজিদের বাইরের দেয়ালের গায়ে ছোট ছোট খোপকাটা টেরাকোটা অলঙ্করণ ইমারতটির বাহ্যিক সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি করেছে। এছাড়াও মসজিদের গায়ে গোলাপ ও লতাপাতার নকশা খচিত পোড়ামাটির কারুকাজ রয়েছে। মসজিদের এই নকশাগুলোই মানুষের কাছে আরো দৃষ্টিনন্দন করে তুলেছে। এধরনের নকশার মসজিদ উত্তর বাংলায় পঞ্চদশ শতকের শেষ দিকে এবং ষোড়শ শতকে খুবই জনপ্রিয় ছিল। মসজিদের উত্তর ও দক্ষিণ বাইরের দেয়ালে ব্যবহৃত ইটের সুক্ষ নকশার সাদৃশ্য দেখা যায় যা ১৫২৩ সালে নির্মিত রাজশাহীর বাঘা জামে মসজিদের সঙ্গে মিল রয়েছে।
মসজিদের ভেতরে পশ্চিম দেয়ালে মিহরাবগুলোতে রয়েছে উন্নতমানের কারুকাজ। মসজিদে ইটের সঙ্গে পাথরের ব্যবহার, দেয়ালের মাঝে পাথরের স্তম্ভ, ইটের গাঁথুনিগুলো চোখে পড়ার মতো। এছাড়া প্রতিটি দরজার নিচে চৌকাঠ পাথরের তৈরি। পূর্বে মসজিদে প্রবেশের সিঁড়ি তৈরি করা হয়েছে কালো বেলে পাথর দিয়ে।
মসজিদের উত্তর পাশে ৩৫০ গজ আয়তনের একটি প্রাচীন দীঘি রয়েছে। দীঘির ১৫ ফুট উঁচু পাড়গুলো বেশ প্রশস্ত। দক্ষিণ পাড়ের মধ্যভাগে একটি প্রশস্ত ঘাট রয়েছে। কারও কারও মতে ঘাটটি প্রায় ৫০ ফুট প্রশস্ত ছিল। ঘাট থেকে প্রায় ১০০ ফুট দক্ষিণ-পশ্চিমে দীঘির দক্ষিণ পাড়ের পশ্চিমাংশের দক্ষিণ দিকে এবং সদর সড়কের উত্তর দিক বরাবর প্রায় ৪ ফুট উঁচু একটি সমতল প্লাটফর্ম রয়েছে। বর্তমানে এটি বাংলাদেশ প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত একটি স্থাপনা।
আনুমানিক ৫৫০ বছর আগে নির্মিত দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে টেরাকোটা অলংকরণ ও পোড়া মাটির চিত্রফলকের দৃষ্টিনন্দন সুরা মসজিদ এখন অস্তিত্ব-সংকটে।
প্রাচীন দৃষ্টিনন্দন এ মসজিদটির নির্মাণশৈলী একনজর দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন হাজারো পর্যটক। স্থানীয় দর্শনার্থীদের পাশাপাশি আশপাশের জেলা থেকে আসা বিভিন্ন বয়সী মানুষের আনাগোনা থাকে বছরজুড়ে। এ মসজিদে এখনো নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা আছে। মসজিদটি সংস্কার এবং এর নির্মাণশৈলী পুনর্র্নিমাণ করা হলে ব্যাপক হারে দেশি-বিদেশি পর্যটকের আগমন ঘটবে। মুসল্লিদেরও নামাজের উত্তম ব্যবস্থা হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা বিপ্লব সরকার বলেন, দেশের অনেক স্থানে অসংখ্য ঐতিহাসিক স্থাপনা আজ বিলীন হবার পথে। তাই বিরল এই স্থাপনা আজ অজান্তে অবহেলায় ধ্বংস হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা, যাতে করে পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের ইতিহাস কে জানতে পারে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ