• বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৫৩ অপরাহ্ন |
শিরোনাম :

সৈয়দ হক আর লিখবেন না আমার বইয়ে মুখবদ্ধ

faruk-62।। এম.উমর ফারুক ।।
২০০৪ সালের শেষ দিকে ঢাকায় চলে আসি। একমাত্র পুজি লেখালেখি। কুড়িগ্রামের জনপদে সাংবাদিকতা করেছি প্রায় সাত বছর। কবিতা লেখার মধ্য দিয়ে সাংবাদিকতায় আমার পর্দাপন। সে কারনেই সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হককে চিনেছি ভিন্নভাবে। বিশেষ করে ২০০৪ সালে আমার লেখা প্রথম উপন্যাসের মোড়ক উম্মোচন করি চিলমারীতে। চিলমারীতে আমার সাংবাদিকতার গুরু এস এম নুরুল আমিন সরকারের পরামর্শে ওই অনুষ্ঠানের  প্রধান অতিথি ছিলেন প্রথম আলোর কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি সফি খান। তিনি তার বক্তব্যে সৈয়দ শামসুল হককে বিস্তর ভাবে তুলে ধরলেন। আমাকে শামসুল হবে সঙ্গে যোগাযোগ করতে বললেন। বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় রাজার মত যার বিচরন সেই শামসুল হকের বাড়ি আমার নিজ জেলায়। ভাবতেই যেন বুকটা ভরে যায়। আমার লেখালেখিতে আরও আগ্রহ জšে§।   সৈয়দ হকের  পরানের গহীন ভিতরে, নিজস্ব বিষয়, রজ্জুপথে চলেছি, বেজান শহরের জন্য কোরাস, অগ্নি ওজলের কবিতা বই গুলো সংগ্রহ করে পড়ে নিলাম। যতই পড়েছি, ততই কবির প্রেমে পড়েছি। প্রাঞ্জল শব্দের গাথুনী তার। সফি খান ভাইয়ের কথা আর লেখালেখির তাড়না থেকে ছুটে আসি ঢাকায়।
ঢাকায় আসার পর প্রথমে দৈনিক যুগান্তরের ফিচার পাতায় কন্টিবিউটিং শুরু করি। প্রায় প্রতিদিন যুগান্তরে যাই। একদিন দেখি সৈয়দ শামসুল হক যুগান্তরে এসেছেন। আমি ছুটে যাই তার কাছে। বিনয়ের সাথে নিজের পরিচয় দেই। সৈয়দ শামসুল হক আমার সালাম গ্রহণ করলেন। কিন্তু কুড়িগ্রামের পরিচয় দেওয়ার পর তেমন কোন আগ্রহ দেখালেন না। প্রথমেই আমার মনটা বিষিয়ে উঠলো। ভাবলাম উনি তো অনেক বড় মাপের লেখক তাই আমাকে পাত্তাই দিলো না। পরে মনে পড়লো সফি খানের কথা। তিনি বলেছিলেন শামসুল হক প্রথমে পাত্তা দেবেন না। তবে লেগে থাকতে হবে। যদি লেগে থাকতে পারো তাহলে সাহিত্যে অনেক সহযোগীতা পাবে। তাই মন থেকে কস্ট মুছে ফেলে আবার তার কাছে গেলাম । শামসুল হক আমাকে দেখেই বললেন, কিছু বলবে। আমি বললাম হ্যা।
ঠিক আছে বলো, কবি সাহেব আমার বাড়ি কুড়িগ্রাম। আমি লেখালেখি করি।
তোমার বাড়ি কুড়িগ্রাম তো আগেই শুনেছি। বার বার বলতে হবে কেন?
তুমি লেখালেখি করো ভাল। লিখতে থাক।
এই বলে চলে গেলেন শামসুল হক। মনটা আরো খারাপ হলো। ভাবলাম  এত অহংকার ওনার।
কিছুদিন পর পাবলিক লাইব্রেরীর এক অনুষ্ঠানে আবার দেখা হলো। অনেক কবি ভিড় ঢেলে সামনে গেলাম। শামসুল হকের হাতটা জোর করে ধরে বললাম, ভাই আমি ফারুক। বাড়ি কুড়িগ্রাম। ঢাকায় থাকি। লেখালেখি করি। পাশে থাকা একজন কবি বললেন, হক ভাইয়ের গ্রামের মানুষ। ওই অঞ্চলের মানুষরা সহজ সরল হয়।
হক সাহেব আমাকে বললেন, কি করো তুমি আমি পুরো পরিচয দিলাম। উনি হাসি দিয়ে বললেন, লেখালেখি  করার নেশায় ঢাকায় এসেছো। এত সাহস তোমার। এই বিশাল মাঠে খেলতে পারবে তো।
আমি বললাম আপনি সহযোগীতা করলে অবশ্যই পারবো।
আবারো হাসি দিয়ে বললেন, শোন অধিকার কেউ দেয় না। অধিকার আদায় করে নিতে হয়। আমার জানা মতে কুড়িগ্রামের মানুষদের সেই ধর্য্য সহ্য কম। দেখ কত দিন থাকতে পারো। এরপর কুড়িগ্রাম সম্পকে কিছু কথা তুলে ধরলেন। চিলমারী বন্দরের সেই ইতিহাস আলোকপাত করলেন। তিনি বললেন কুড়িগ্রাম জেলার সবচেয়ে  প্রাচীন ইতিহাস ঐতিহ্যের উপজেলা হচ্ছে চিলমারী। খুব মনে পড়ে গরুর গাড়ীতে করে চিলমারী যাওয়ার কথা। কাঠের তৈরী গরুর গাড়ীর ক্যাচর ক্যাচর শব্দ আর গাড়িয়ালের গান। এখন শুধুই স্মৃতি।
পাশে বসে অন্যজনের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, কুড়িগ্রামের ধরলা নদী পাড়ি দিয়ে নাগেশ্বরী যাতায়াত করা লাগে। যখন ধরলার পানি শুকিয়ে যায় তখন অনেক দুর বালুর পথ হেটে ঘাটে আসতে হত। জুতা, স্যান্ডেল হাতে নিয়ে সেই বালুপথ পাড়ি দিতাম। আর কত মজা হত। এ কথা বলে সৈয়দ  হক হাসলেন। তার সাথে উপস্থিত সকলেই হাসলেন। সৈয়দ হকের মুখে এমন কথা শুনে কিছুটা মনোবল পেলাম। এরপর রাজধানীর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তার সঙ্গে দেখা হয়, সংক্ষিপ্ত সময়ে কুশলাদি বিনিময় হয়।
২০০৮ সালে একটি কবিতার বই প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেই। প্রায় ৬০ টা কবিতা নির্বাচিত করি বইয়ের জন্য। এরপর ছুটে যাই সৈয়দ শামসুল হকের বাসায়। দেখা করে মনের বাসনা জানাই। আমার এই কবিতার বইটির মুখবদ্ধ আপনি লিখে দেবে। এ কথা শুনে কবিতাগুলো হাতে নিয়ে কিছু সময় ধরে উল্টে পাল্টে দেখলেন।  আমি মনে মনে ভাবলাম হক ভাই মুখবদ্ধ লিখে দিলে বইটা পাঠক সাড়া পাবে। আর আমি সাহিত্যের মাঠে একটু হলেও থাকতে পারবো।
কিন্তু না । কিছুক্ষণ পর অনেকটা বিরক্তির স্বরে বললেন, ফারুক তোমার কবিতা হয়েছে। কিন্তু আমি এ ধরনের কবিতার বইয়ের জন্য মুখবদ্ধ লিখবো না। অন্য কাউকে দিয়ে লিখে নাও। পারলে কবি আবু হাসান শাহরিয়ার এর কাছে যেতে পারো।  সে তোমার লেখাকে পছন্দ করলে মুখবদ্ধ লিখে দিতে পারেন। আর সমসাময়িক কবিদের মধ্যে শাহরিয়ার অনেক ভাল লেখে। তার শব্দ ভান্ডার অনেক। আর কোন যেহেতু তুমি আমার জেলার ভাই সেহেতু তোমার বইয়ের মুখবদ্ধ আমি লিখে দেব অন্য কোন বইয়ের জন্য। আরো ভাল করে কিছু কবিতা সাজাও। পান্ডুলিপি হাতে নিয়ে ফিরে এলাম। যাওয়া হলো না আবু হাসান শাহরিয়ার এর কাছে। কেননা, দৈনিক যুগান্তরে কাজ করার সুবাধে আবু হাসান শাহরিয়ার সম্পর্কে জেনেছি। তিনি আর অনেক কঠিণ মানুষ। সাহিত্যে চুল পরিমান ছাড় দেন না তিনি। পরবর্তিতে কবি আবু হাসান শাহরিয়ার দৈনিক আমাদের সময় পত্রিকার সম্পাদক হন। তিনি সম্পাদক থাকা সময়ে আমি সিনিয়র রিপোর্টার হিসেবে কাজ করি। এ সময়ে দেখেছি আবু হাসান শাহরিয়ারকে নিয়ে সৈয়দ হক যা বলেছিলেন তার বাস্তবতা।  পরে কবি ফরহাদ খাঁ কে দিয়ে ওই বইয়ের মুখবদ্ধ লিখে নেই। ফরহাদ খাঁ স্বস্ত্রীক খুন হয়েছেন তার পল্টনের বাসায়।
কিন্তু মনের মধ্যে সব সময় কাজ করে  তাড়া করে শামসুল হকে সেই কথা। তাই লিখে যাই কবিতা। কবিতা গুলো একত্র করে আমার পরিচিত কয়েকজন কবিকে দেখিয়েছি । তারা সম্পাদনাও করে দিয়েছেন। কারন এবার যেন সৈয়দ হকে কাছে গিয়ে ফিরে আসতে না হয়। মনে ভিতরে আশা ছিল আমার কবিতার ২য় বইটির মুখবদ্ধ সৈয়দ হকের কাছ লিখে নেব। তাহলে আমার সাহিত্য  জীবনের পূর্নতা পাবে। কিন্তু তার মৃত্যুর খবরে তছনছ হয়ে যায় সে স্বপ্ন। মনের মধ্যে বার বার নাড়া দিচ্ছে কথা রাখলেন না শামসুল হক। আর লিখে দেবেন না আমার কবিতার বইয়ে মুখবদ্ধ।
আমার বাড়ি কুড়িগ্রামের উলিপুরে। কবি শুয়ে থাকবেন কুড়িগ্রাম উলিপুর সডকের পাশে সরকারী কলেজের মাঠে। বাড়ি যাওয়ার পথে তার কবরের পাশে দাড়িয়ে শ্রদ্ধা জানাতে পারবো। তখন কবিকে বলবো কেন লিখে দিলে না আমার বইয়ের মুখবদ্ধ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ