• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:২৩ অপরাহ্ন |

ফেসবুক লাইভে সনদ ছিঁড়ে ফেলা সেই বাদশা এখন কৃষক

সিসি নিউজ।। চাকরি না পেয়ে স্নাতকসহ সকল একাডেমিক সার্টিফিকেট ছিঁড়ে ফেলা বেকার যুবক বাদশা মিয়া এখনো বেকারত্ব জীবন নিয়ে বেঁচে আছে। নীলফামারীর ডিমলার ওই যুবক চাকুরীর জন্য প্রায় ২০টি সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা দেওয়ার পরও মেলেনি চাকুরী। এভাবে পার হয়ে যায় সরকারী চাকুরীর বয়সের সীমা। পরে হতাশা ও মনের আবেগে ২০২২ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর দুপুরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক লাইভে নিজের শিক্ষাজীবনে অর্জিত সকল একাডেমিক সার্টিফিকেট ছিঁড়ে ফেলেন তিনি।

মঙ্গলবার দুপুরে সরেজমিনে ডিমলা উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ সুন্দর খাতা গ্রামের ধানখেতে দেখা হয় বাদশা মিয়ার সাথে। তীব্র রোদ উপেক্ষা করে তিনি নিজের জমির ধান কেটে কাঁধে নিয়ে বাড়ির উঠানে বয়ে আনছে। বয়সের ভারে বাবা তার সাথে মাঠের কাজে সহযোগিতা করছে। তাই পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যাক্তি হিসেবে বাদশাই সংসারের হাল ধরেছেন। সামান্য আবাদি জমির ফসল দিয়ে কোন রকমে দিনযাপন করছেন তারা।

প্রতিবেশি জিকরল হক জানান, বাদশা মিয়া এ গ্রামের বাসিন্দা কৃষক মহুবার রহমানের ছেলে। অভাবের সংসারে ছয় ভাই-বোনের মধ্যে বাদশাই সবার বড়। ২০১৪ সালে সে নীলফামারী সরকারি কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক সম্পন্ন করেন। তবে অর্থের অভাবে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করতে পারেননি। বাদশা ২০০৭ সালে বিজ্ঞান বিভাগে দাখিল, ২০০৯ সালে বিজ্ঞান বিভাগে আলিম সম্পন্ন করেন।

বাদশা মিয়া বলেন, ‘আমার বাবা খেয়ে-না খেয়ে আমাকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন। বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা-মা ও ছোট ভাই-বোনদের মুখের দিকে তাকাতে পারি না। বর্তমান সমাজে সবচেয়ে অসহায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষিত ছেলে। এরা না পারে চাকরি জোটাতে, আবার অর্থের অভাবে না পারে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে।’ তাই চুপিসারে ঢাকা ও বগুড়া শহরে প্রায়ই সময়ে রিক্সা চালিয়ে উপার্জন করেছি। এলাকার কৃষি শ্রমিকদের সাথে দক্ষিণাঞ্চলের অনেক জায়গায় কৃষি শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে হয়েছে।

তিনি বলেন, সনদ ছিঁড়ে ফেলার পর রোজ নামে একটি কুরিয়ার সার্ভিস আমাকে চাকুরী দিয়েছিল। কিন্তু সেখানে তিন মাস চাকুরী করার পর এক মাসের বেতন দেওয়ায় চাকুরী ছেড়ে চলে এসেছি। অপরদিকে ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঢাকায় কনস্ট্রাকশনের কাজে পাঠিয়ে ছিলেন। কিন্তু সেখানে শ্রমিক হিসেবে আমাকে দৈনিক হাজিরায় কাজ দেওয়ায় তা ছেড়ে চলে আসি।

ভুক্তভোগী বাদশা সনদ ছিঁড়ে ফেলার ভিডিওতে বলেছিলেন, ‘আসলে আমার ভাগ্যটাই খারাপ! কত মানুষ ভুয়া সার্টিফিকেট নিয়া করে খাচ্ছে। আর আমি এত সার্টিফিকেট নিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরেও একটা সরকারি বা বেসরকারি চাকরি জোটাতে পারিনি। সার্টিফিকেট অনুযায়ী চাকরির বয়স শেষ, এখন এগুলো রেখে লাভ কী? বয়স থাকতেই তো চাকরি জোটাতে পারিনি।’

বাদশার বাবা মহুবার রহমান জানান, চাকরির বয়সসীমা শেষ হওয়ায় বেশ কিছুদিন থেকে হতাশায় ভুগছিল বাদশা। দিনে দিনে হতাশা বেড়ে যাওয়ায় সে তার একাডেমিক সার্টিফিকেটগুলো কাউকে না জানিয়ে ছিঁড়ে ফেলেছে। বর্তমানে সংসার চালানো খুবই কষ্টকর। নিজের মাত্র তিন বিঘা জমি। তিন মেয়ের বিয়ে দেওয়ার পর এখন সঞ্চয় বলে কিছু নেই। ছোট ছেলে বিএ পড়ছে। সবকিছু মিলে বেকার ছেলে বাদশাকে নিয়ে মাঠে কাজ করছি। তিনি নিজেও ঢাকায় গিয়ে রিক্সা চালানোর কথা জানান।

এ বিষয়ে ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘চাকরি ছেড়ে চলে আসার বিষয়টি জানা ছিল না। বাদশা যদি চায় তাহলে তাকে আইসিটি কিংবা অন্য কোনো বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করা হবে। পরবর্তীতে সেই দক্ষতা ভিত্তিক চাকরির ব্যবস্থা করা যাবে।’


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

আর্কাইভ