• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৪৯ অপরাহ্ন |

দক্ষিনের জেলায় যাচ্ছেন উত্তরের কৃষিশ্রমিকেরা

বিশেষ প্রতিনিধি।। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসের এ সময়ে উত্তরাঞ্চলের রংপুর বিভাগের কয়েকটি জেলায় কোনো কাজ না থাকায় অলস সময় কাটান কৃষিশ্রমিকরা। এসব জেলায় খেতের ইরি-বোরো ধান পাকতে এখনো এক মাসের অধিক সময় বাকি। তাই মাঠে কোনো কাজ না থাকায় উপার্জনহীন কৃষিশ্রমিকরা পুঁজি হারিয়ে দাদন ব্যবসায়ীর শরণাপন্ন হতে হয়। এছাড়া প্রায়ই শ্রমিকের সংসারের টুকিটাকি কাজের জন্য এনজিও থেকে নেওয়া ঋণের সাপ্তাহিক কিস্তি রয়েছে। তাই তারা কাজের সন্ধানে পরিজন ছেড়ে রওনা দিচ্ছেন দেশের দক্ষিনাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বোরো মৌসুমে প্রতিবারের মতো এবারেও দক্ষিনাঞ্চলের বোরোচাষিরা কৃষি শ্রমিকের সংকটে রয়েছেন। বিশেষ করে জয়পুরহাট, পাঁচবিবি, আক্কেলপুর, সান্তাহার, আদমদিঘী, আত্রাই, নওগাঁ, নাটোর, যশোর, খুলনাসহ বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় এ সংকট। তাই উত্তরের হাজার হাজার কৃষিশ্রমিক কাজের সন্ধানে ট্রেনে, বাসে ও খোলা পিকআপে চড়ে ওইসব এলাকায় ছুটছেন। প্রতিদিন সকালে নীলফামারীসহ পঞ্চগড়ের দেবিগঞ্জ, দিনাজপুরের পার্বতীপুর, খানসামা ও চিরিরবন্দর, রংপুরের তারাগঞ্জ ও বদরগঞ্জ উপজেলার দিনমজুররা ভিড় করছেন উত্তরের রেলওয়ে স্টেশনগুলোতে। বিশেষ করে চিলাহাটি, ডোমার, নীলফামারী ও সৈয়দপুরে রেলওয়ে স্টেশনে কৃষিশ্রমিকদের উপচেপড়া ভিড়।

সৈয়দপুর রেলওয়ে স্টেশনে খুলনাগামী রকেট মেইল ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছেন নীলফামারী সদর উপজেলার চড়াইখোলা ইউনিয়নের বটতলী এলাকার কৃষিশ্রমিকের সর্দার আশরাফুল হক । তিনি বলেন, গ্রামের ১০ জনের একটি দল নিয়ে ধান কাটতে যাচ্ছেন বগুড়া জেলার সান্তাহারে। ওই এলাকায় প্রতিবছর ধান কাটতে যান তারা। ওখানকার গৃহস্থদের সাথে এই কৃষিশ্রমিক সর্দারের যোগাযোগ রয়েছে। তিনি জানান, মাঠে ধান পাকলে মোবাইল ফোনে আমাদের ডেকে নেয় সান্তাহারের গৃহস্থরা।

কথা হয় কৃষিশ্রমিক জগদীশ চন্দ্র রায়ের সাথে। তাঁর বাড়ি নীলফামারী সংলগ্ন দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার রামকলা গ্রামে। ওই কৃষিশ্রমিক জানান, কাজ না থাকায় প্রায় এক মাস থেকে বসে আছি। অল্প পুঁজি ছিল তা শেষ হয়ে গেছে। এবারে আমার মেয়ে এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। দাদন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে টাকা নিয়ে মেয়ের জন্য নতুন জামা-কাপড়, জুতা কেনা ও পরীক্ষা কেন্দ্রে যাতায়াতের খরচ চালাতে হয়েছে। তাই পরিবারে সদস্যদের মুখের দিকে তাকিয়ে আর দাদন ব্যবসায়ীর টাকা পরিশোধ করার জন্য গ্রামের অন্যান্য কৃষিশ্রমিকদের সাথে নাটোর জেলায় ধান কাটতে যাচ্ছি। তিনি জানান, গতবছরে নওগাঁর আত্রাইয়ে ধান কাটতে গিয়েছিলাম। চুক্তিভিত্তিক ধান কাটতে গিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৯০০ থেকে ১০০০ টাকা মজুরী পাওয়া যায়। রাতে থাকা ও তিনবেলা খাবার গৃহস্থরা বহন করায় ভালো উপার্জন হয়।

এদিকে অনেকে ট্রেনের টিকিট সংগ্রহ করার পরেও যাত্রীদের ভিড়ে ট্রেনে উঠতে পারছে না। তাই বিকল্প পথে অতিরিক্তি টাকা খরচ করে গন্তব্যে যাচ্ছে কৃষিশ্রমিকরা। রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার আলমপুরের কৃষিশ্রমিক মেহের আলী ও আবু তালেব জানান, টিকিট কাটতে আইডি কার্ড লাগে তা জানতেন না। তাই আসন ছাড়া টিকিট সংগ্রহ করতে পেরেছেন খুলনাগামী ‘রুপসা এক্সপ্রেস’ ট্রেনের। কিন্তু যাত্রীদের ভিড়ের চাপে ওই ট্রেনে উঠতে পারেনি তারা। তবে স্টেশন কর্তৃপক্ষ মানবিক দিক বিবেচনা করে এসব কৃষিশ্রমিকদের পরবর্তী ট্রেনে গন্তব্যে পৌছানোর ব্যবস্থা করেছেন এমনটি জানালেন তারা।

সৈয়দপুর রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার ওবাইদুল ইসলাম রতন জানান, গত ৩/৪ দিন থেকে খুলনা ও রাজশাহীগামী ট্রেনগুলোতে যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড় দেখা যাচ্ছে। এর মূল কারণ হলো উত্তরের জেলা থেকে কৃষিশ্রমিকরা ছুটছে দক্ষিনাঞ্চলে। তিনি বলেন, আসনের কয়েকগুন বেশি আসন ছাড়া টিকিট বিক্রি হচ্ছে। কৃষিশ্রমিকদের সংকট লাঘবে এবং গৃহস্থরা দ্রুত মাঠের ধান যেন ঘরে তুলতে পারে- এ কথা মাথায় রেখে আসনবিহীন টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে। তবে কেউ যাতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনের ছাদে ভ্রমন করতে না পারে সেজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি রেলওয়ে পুলিশ সজাগ রয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

আর্কাইভ