• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩৯ অপরাহ্ন |

প্রশ্ন ফাঁস ঠেকাতে ডিজিটাল সমাধান দিল বুয়েট

146112_1প্রযুক্তি ডেস্ক: বর্তমান পদ্ধতিতে প্রশ্ন ফাঁসের ঝুঁকি বেশি। প্রশ্ন প্রণয়ন থেকে বিতরণ পর্যন্ত ৩৯টি ধাপ রয়েছে। ধাপগুলোর মধ্যে একটি প্রশ্নপত্র ২২৫ জনের হাত ঘোরে। একজন যদি একটি শব্দও মুখস্থ করে তাতেও পুরো প্রশ্ন আয়ত্ত করা সম্ভব। তাই ছাপানো পদ্ধতির বিকল্প চিন্তা করার সময় এসেছে। আর ডিজিটাল পদ্ধতিতে এই প্রশ্ন ফাঁস রোধ করা সম্ভব। এ ব্যাপারে সরকারের উচ্চ মহল থেকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও পর্যন্ত একমত।

প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকানো যায় এমনই একটি ‘ডিজিটাল প্রশ্ন পদ্ধতি’র মডেল উপস্থাপন করেছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের বুয়েটের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও কৌশল বিভাগ (সিএসই)। গতকাল সোমবার একটি সেমিনারে মডেলটি তুলে ধরা হয়। ডিজিটাল প্রশ্ন পদ্ধতির নাম দেওয়া হয়েছে ‘স্মার্ট প্রিন্টিং সলিউশন’।

বুয়েটের সিএসই মিলনায়তনে বেসরকারি সংগঠন ‘জার্নি’র সহযোগিতায় ‘পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস রোধে ডিজিটাল প্রশ্ন পদ্ধতির উদ্যোগ ও বাস্তবতা’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনারের আয়োজন করা হয়। সেমিনারে মডেল উপস্থাপন করেন সিএসই বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মোস্তফা আকবর।

বুয়েটের উপস্থাপিত মডেলে বলা হয়, পাবলিক পরীক্ষার জন্য একটি সেন্ট্রাল সার্ভার থাকবে। এতে থাকবে কয়েক সেট প্রশ্ন। এই সার্ভারের অধীনে প্রয়োজন অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন স্থানে কেন্দ্র করা হবে। এসব কেন্দ্রে ট্যাব, ল্যাপটপ, কম্পিউটার, প্রিন্টার ও ফটোকপি মেশিন থাকবে। এরপর পরীক্ষার আগের রাতে কেন্দ্রে থাকা ট্যাব বা কম্পিউটারে পৌঁছে যাবে প্রশ্ন। তবে এটা খোলার জন্য লাগবে পাসওয়ার্ড, যা পরীক্ষার দুই ঘণ্টা আগে সরবরাহ করা হবে। প্রশ্ন ডাউনলোড করে শুরু হবে প্রিন্ট। একেক কালার পেজে বিভিন্ন প্রশ্নের সেট প্রিন্ট করা হবে। আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টার মধ্যে প্রিন্টিং-প্রক্রিয়া সমাপ্ত হবে। এর পরের ঘণ্টায় প্যাকেট করা প্রশ্ন পৌঁছে দেওয়া হবে প্রতিটি কেন্দ্রে। প্রতিটি ধাপেই নিরাপত্তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে কেন্দ্রের কার্যক্রম মনিটর করা হবে। দুই থেকে তিন ঘণ্টায় পুরো প্রক্রিয়া শেষ হওয়ায় এতে ফাঁস হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকবে। তবে এ প্রক্রিয়ায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের সহযোগিতা প্রয়োজন হবে।

বুয়েটের উপস্থাপিত এই মডেলের সঙ্গে উপস্থিত সবাই একমত পোষণ করলেও এ পদ্ধতির আরো উন্নয়ন ঘটাতে বলেছেন সেমিনারে উপস্থিত বক্তারা। কারণ দুই থেকে তিন ঘণ্টায় বেশির ভাগ কেন্দ্রেই প্রশ্ন পৌঁছে দেওয়া সম্ভব নয়। তাই প্রতিটি কেন্দ্রেই এ প্রশ্ন ছাপার কথাও উঠে এসেছে। আবার কেউ কেউ মাল্টিমিডিয়া ব্যবহারের কথা বলেছেন। তবে সবাই একমত হয়েছেন, এ ব্যাপারে আরো সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজনে একবার কিছু টাকা বিনিয়োগ করতে হবে। শিক্ষা বোর্ড, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, সরকারি কর্ম কমিশন, শিক্ষক নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ যারা পাবলিক পরীক্ষা নেয় তাদের একত্র হয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

সেমিনারে শিক্ষাসচিব নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘আমাদের বড় সমস্যা অর্থ সংকট। ডিজিটাল পদ্ধতিতে পাবলিক পরীক্ষা নেওয়া একটি ব্যয়বহুল ব্যাপার। তবে এ ক্ষেত্রে সবার সহযোগিতা পেলে সমস্যা থাকবে না। আর আমাদের ম্যানুয়াল পদ্ধতি ছেড়ে ডিজিটাল পদ্ধতিতে অগ্রসর হওয়া ছাড়া কোনো বিকল্পও নেই। তবে জেলায় জেলায় প্রশ্ন প্রিন্ট করে পরীক্ষা নেওয়া হলে জটিলতা তৈরি হবে। কারণ অনেক কেন্দ্রেই সকালে প্রশ্ন ছেপে তা পৌঁছানো সম্ভব হবে না। তাই যে কেন্দ্রে পরীক্ষা হবে, সে কেন্দ্রে প্রিন্ট করতে হবে। তবে এর আগে একটি প্রশ্নব্যাংক থাকতে হবে।’

প্রযুক্তিবিদ ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. কায়কোবাদ বলেন, ডিজিটালাইজ পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করা হলে পরীক্ষার আগেই প্রশ্ন ফাঁসের আর কোনো সুযোগ থাকবে না। তবে প্রযুক্তির দক্ষ ও সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপউপাচার্য অধ্যাপক ড. মুনাজ আহমেদ নূর বলেন, ‘আমাদের প্রতিটি প্রশ্নই চার পাতার। পাঁচ হাজার শিক্ষার্থী আছে- এমন কেন্দ্রের সংখ্যাও অনেক। সে ক্ষেত্রে এত প্রিন্ট করতে গেলে প্রতিবার প্রশ্ন ছাপাতে একাধিক প্রিন্টার ব্যবহার করতে হবে। তাতে খরচ বেড়ে যাবে। তাই নির্দিষ্ট এলাকায় প্রেস করার কথা ভেবে দেখতে হবে।’

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আলমগীর বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যেই বুয়েটের এ পদ্ধতিতে পাঁচটি জেলায় প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা নিয়েছি। আগামী ২৮ আগস্ট আরো ১৭ জেলায় একই পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়া হবে। এক কেন্দ্রে ১০ থেকে ১২ হাজার পরীক্ষার্থীও ছিল। তাদের প্রশ্ন ছাপাতে আমাদের কোনো সমস্যা হয়নি।’

ব্যানবেইজের পরিচালক মো. ফসিউল্লাহ বলেন, ‘আগামী তিন-চার বছর পর সবই আইটি-নির্ভর হয়ে যাবে। সে জন্য প্রস্তুতি নিতে আমাদের আজ থেকেই শুরু করতে হবে। আর ডিজিটাল পদ্ধতিতে যে খরচের কথা বলা হচ্ছে সমন্বিতভাবে করা হলে তা কমে আসবে। আর সব শিক্ষকই যাতে প্রশ্ন করতে পারেন, এ জন্য প্রশ্ন ব্যাংক থাকতে হবে।’

বুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক খালেদা ইকরাম বলেন, ‘প্রযুক্তির ব্যবহারে প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ সম্ভব। এর বিকল্প কিছু নেই। ডিজিটাল পদ্ধতিতে প্রশ্ন প্রণয়ন ও বিতরণের বিষয়টি আমাদের এখনই ভাবতে হবে।’

সেমিনারে সবার শেষে প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘সবার সমন্বিত উদ্যোগেই এই প্রশ্ন ফাঁস রোধ করতে হবে। এ জন্য ডিজিটাল পদ্ধতির বিকল্প নেই।’

সেমিনারে সিএসই বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মাহফুজুল ইসলামের সভাপতিত্বে আরো বক্তব্য দেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. জ্ঞানেন্দ্রনাথ বিশ্বাস প্রমুখ।

উৎসঃ   কালের কণ্ঠ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ