সিসি ডেস্ক: গত পাঁচ বছর ধরে হামলা-মামলায় বিপর্যস্ত জামায়াত-শিবির। এই সময়ে জোটভুক্ত হওয়ায় বিএনপির ঘাড়ে ভর করে কয়েকটি সভা-সমাবেশ ছাড়া রাজপথে নামার খুব বেশি একটা সুযোগ পাননি দলটির নেতাকর্মীরা। তবে ভার্চুয়াল মিডিয়ায় সরকারের বিরুদ্ধে ঠিকই বেশ সরব যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত কোণঠাসা জামায়াতে ইসলামী এবং এর আদর্শের উত্তরসূরি সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির।
জানা গেছে, মানবতাবিরোধী অপরাধে কারান্তরীণ দলের শীর্ষ ১০ নেতার মধ্যে ফাঁসিতে দুইজনের এবং অসুস্থ অপর তিন নেতার মৃত্যুতে শোকে মুহ্যমান জামায়াত-শিবির। এই সময়ে দল দুটির কর্মী রিক্রুট এবং সাংগঠনিক তৎপরতায় অনেকটাই স্থবিরতা নেমে আসে। কিন্তু এই বৈরী পরিবেশেও প্রযুক্তিতে পিছিয়ে নেই উভয় সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এ ক্ষেত্রে তারা অনেকটাই এগিয়ে গেছে। বিশেষ করে মানবতাবিরোধী অপরাধে বিচারাধীন দলটির শীর্ষ নেতাদের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণায় তারা খুবই সক্রিয়। এর মধ্যে ফেসবুক-ইউটিউব-টুইটার থেকে শুরু করে বিভিন্ন বস্নগে সরকারের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে ভূমিকা রাখছে ভার্চুয়াল মিডিয়ার এসব মাধ্যম।
সূত্র জানায়, জামায়াত-শিবিরের আইটি (তথ্যপ্রযুক্তি) বিশেষজ্ঞ দলের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে ভার্চুয়াল মিডিয়ায় প্রচারণার কাজ। দীর্ঘদিন ধরে উভয় সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় বন্ধ থাকলেও ঠিকই প্রতিদিনই আপডেট হচ্ছে সংগঠনের সব কর্মকা-ের খবরাখবর। উভয় দলেরই পৃথক ওয়েবসাইটের পাশাপাশি দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মীরাও নিজেদের উদ্যোগে স্বতন্ত্র সাইট বানিয়ে সরকারবিরোধী কথাবার্তা ছড়াচ্ছেন। এসব কাজের জন্য শিবিরের প্রতিটি থানা, উপজেলা এবং জোন পর্যায়ে আইটি বিশেষজ্ঞদের দিয়ে গঠন করা হয়েছে ‘বিশেষ আইটি টিম’। তারাই এসব কাজের মূল অ্যাডমিন। তবে অনলাইনে যেসব অ্যাকাউন্ট ও সাইটে জামায়াত নেতাদের পক্ষে প্রচারণা চালানো হচ্ছে, সেগুলোর মূল নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করছে শিবিরের ‘বাঁশের কেল্লা’। এছাড়া জামায়াত-শিবির নিয়ন্ত্রিত ‘সোনার বাংলা’, ‘শিবিরের দখলে ফেসবুক’, ‘আমরা সাঈদীভক্ত’, ‘স্টোরি অব বাংলাদেশ’, ‘মাইক’, ‘এসো আলোর পথে’, ‘সংগ্রামী জনতা’, ‘মুক্তির দিশারী’, ‘মতিঝিল স্কয়ার’, ‘আসলে আমরা সবাই পারি’, ‘ধরা পড়লে মনে থাকে না’, ‘ধরে ধরে ধরে না, ধরলে শিবির ছাড়ে না’, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’, ‘মুক্তির মিছিল’ এবং ‘সাঈদী মুক্তি পরিষদ’সহ অসংখ্য পেজে চলছে প্রচারণা। এসব পেজ এবং ব্যক্তিগত আইডি থেকে দেশে যুদ্ধ বাধানোর হুমকিও দেয়া হচ্ছে। ‘আমি কাদের মোল্লা’ নামের একটি ফেসবুক আইডিতে পোস্ট করা হয়েছে, ‘আগামী কিছুদিনের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হতে যাচ্ছে। আমি কিন্তু কারো নির্দেশের অপেক্ষায় নয়, নিজেই সর্বক্ষণ প্রস্তুত আছি। এবার হবে টার্গেটভিত্তিক আন্দোলন।’
শিবিরের নেতারা বলছেন, বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে অনলাইন বা সাইবার যুদ্ধ অন্যতম ভূমিকা পালন করে। তাই মাঠ পর্যায়ের দায়িত্বশীলদের জোর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিটি জেলা, উপজেলা ও জোন পর্যায়ে আইটি টিম গঠন করা হয়েছে। তারা যে কোনো বিষয়ে কেন্দ্রের নির্দেশনাসহ যে কোনো তথ্য দ্রুত ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিতে কাজ করছেন।
এছাড়া জামায়াত-শিবিরের কেন্দ্র থেকে মাঠ পর্যায়ে কর্মীদের কমপক্ষে মোবাইল ফোনসেটে হলেও যে কোনো কার্যক্রমের বিষয়ে অনলাইনে সক্রিয় থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একযোগে যে কোনো তথ্য ছড়ানোর পর মাঠ পর্যায়েও ব্যাপক সাড়া জাগাতেই এই কৌশল। ‘সাঈদী মুক্তি পরিষদ’ নামের ফেসবুক পেজের ওয়ালে ‘যুদ্ধাপরাধ নয়, জনপ্রিয়তাই যার অপরাধ’ লেখা একটি পোস্টার দেয়া হয়েছে। এতে সাঈদীর নিঃশর্ত মুক্তি চাওয়া হয়েছে। ‘বাঁশের কেল্লা’জুড়ে আছে ‘ফ্রি ফ্রি, সাঈদী ফ্রি’ লেখা পোস্টার। এর ওপরে লেখা রয়েছে_ ‘কে বলেছে রাজাকার, সাঈদী মোদের অহঙ্কার।’
সূত্র জানায়, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাধার কারণে প্রকাশ্যে তৎপরতা না চালিয়ে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা এখন সংগঠিত হতে ব্যবহার করছে প্রযুক্তিকে। অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে স্বাক্ষর সংগ্রহ, মেইল আদান-প্রদান এবং মোবাইল ফোনসেট ব্যবহারের মাধ্যমে দেশ-বিদেশে চলছে তাদের যোগাযোগ। যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত নেতাদের মুক্তির জন্য দেশ-বিদেশে বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে তাদের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে নানা রকম কৌশলে। এছাড়া নেতাদের পক্ষে অসংখ্য বই ও বুকলেট ইংরেজিতে অনুবাদ করে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে অনলাইনে। এজন্য ইন্টারনেটে কনটেন্ট তৈরিসহ আপলোডের ক্ষেত্রে দেশের নামিদামি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ, এমনকি বুয়েটের শিক্ষার্থীদেরও কাজে লাগাচ্ছে জামায়াত শিবির। বুয়েটে সীমিত সংখ্যক শিক্ষার্থী রাজনীতি করলেও অনলাইনকেন্দ্রিক ‘রাজনৈতিক বার্তা’ ছড়িয়ে দিতে সেখানকার ছাত্রদের কাজে লাগানো হচ্ছে। শিবিরের বুয়েট শাখার কিছু ‘অনলাইনকর্মী’ও রয়েছেন। তারা সাধারণত ‘পেইড বস্নগার’ হিসেবে কাজ করে থাকেন। বিভিন্ন ফোরামে শিবিরের প্রচারণা চালানোসহ শিবিরের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগের জবাব অনলাইনে দেয়ার কাজ করেন তারা। শিবিরের প্রায় ১০-১২ জনের একটি গ্রুপ তাদের কাজের বদলা বাবদ সংগঠনের তহবিল থেকে বেশ মোটা অঙ্কের ইন্টারনেট বিল নিয়ে থাকে। বিভিন্ন ধরনের ওয়েবসাইটসহ ফেসবুক, ইউটিউব, বস্নগ ইত্যাদির মাধ্যমে দেশ-বিদেশে প্রতিদিন লাখো মানুষের কাছে নিজেদের ‘বার্তা’ পেঁৗছাচ্ছেন দল দুটির নেতাকর্মীরা। এর মধ্যে ‘বার্তা’ পেঁৗছানোর অন্যতম সাইট হচ্ছে ‘ফ্রি জামায়াত লিডার্স’। এটি টাকার বিনিময়ে তৈরিকৃত একটি ডেডিকেটেড সাইট। এখানে প্রতিদিন জামায়াত-শিবিরের নানা রকম খবরাখবর আপডেট করা হয়। সেই সঙ্গে করা হয় সরকারের তীব্র সমালোচনাও। সাইটটিতে ফেসবুকের মাধ্যমে প্রায় ৫ হাজারের বেশি লাইক পড়েছে। যোগাযোগের জন্য কোনো ঠিকানা বা ফোন নাম্বার দেয়া হয়নি ওই সাইটে। সাইটটির প্রথমদিকে তিনটি কথা লেখা রয়েছে। এর মধ্যে প্রথমটি হলো ‘জামায়াত নেতাদের মুক্তি আন্দোলন’, দ্বিতীয়টি ‘এই গ্রেপ্তার নেহায়েত ক্ষমতার অপব্যবহার ছাড়া আর কিছুই নয়’ এবং তৃতীয়টি হলো ‘রাজনৈতিক এই নিপীড়ন মানবতাবিরোধী’। এছাড়া অন্যান্য বড় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদেরও কাজে লাগাচ্ছে জামায়াত-শিবির।
জানা গেছে, ‘ফাইট অ্যাগেইনস্ট হাসিনা অ্যান্ড অল ইন্ডিয়ান এজেন্ট টু সেভ বাংলাদেশ’ নামের ফেসবুকে একটি গ্রুপ খুলেছেন জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা। এছাড়া অনলাইনে প্রচারণার জন্য জামায়াতের উদ্যোগে প্রকাশ করা হয়েছে অসংখ্য বই, লিফলেট ও পোস্টার। প্রচারের জন্য যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াত নেতারা নিজেদের নির্দোষ দাবি করে লিখেছেন বিভিন্ন পুস্তিকা। এসব পুস্তিকা আটক হওয়ার আগে থেকেই তৈরি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সূত্রগুলো।