সিসি ডেস্ক: দিনাজপুরে রাজনৈতিক ময়দান আর আগের মতো সরগরম ও উত্তপ্ত নেই। সব দলেই স্থবিরতা চোখে পড়ার মতো। বিশেষ বিশেষ দিনে কিছু কর্মসূচি পালন ছাড়া কোনো কর্মকাণ্ডে দেখা যায় না ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাপা ও জামায়াতে ইসলামীকে। এক দিকে ধরপাকড় ও মামলায় পর্যুদস্ত হয়ে পড়েছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। এ দলের নেতাকর্মীদের সচরাচর এখন জনসম্মুখে দেখা যায় না। বাড়িতে খোঁজ নিয়েও পাওয়া যায় না। অন্য দিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-হুইপ গ্রুপের মধ্যে দ্বন্দ্বে দল গোছাতে পারছে না আওয়ামী লীগ।
আওয়ামী লীগ : দিনাজপুরে মন্ত্রী এবং হুইপ গ্রুপের দ্বন্দ্বের কারণে হযবরল অবস্থা বিরাজ করছে আওয়ামী লীগে। এ দ্বন্দ্বের কারণে স্থবির হয়ে পড়ছে জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড। একই অবস্থা অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যেও। এক গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন মন্ত্রী অ্যাডভোকেট মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার। অন্য গ্রুপের নেতা সদর আসনের সংসদ সদস্য ও হুইপ ইকবালুর রহিম। তবে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে ঐক্য না থাকলেও নিয়োগবাণিজ্য, বরাদ্দ ভাগাভাগি ও টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ওই দুই নেতার অনুসারীদের মধ্যে ঐক্য ঠিকই রয়েছে।
দুই নেতার পরস্পরবিরোধী সম্পর্কের প্রভাব পড়েছে তৃণমূল নেতাকর্মীদের ওপর। এর ফলে ভেঙ্গে পড়েছে দলটির চেইন অব কমান্ড। সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আমজাদ হোসেনের মৃত্যুর পর সভাপতির দায়িত্ব পান প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী অ্যাডভোকেট মোস্তাফিজুর রহমান। আওয়ামী লীগের অধিকাংশ ত্যাগী নেতাকর্মী রয়েছেন মন্ত্রীর গ্রুপে। দলের এ গ্রুপ সংসদ সদস্য ও হুইপ ইকবালুর রহিমকে সহজভাবে নিতে পারেনি। ইকবালুর রহিমের পিতা অ্যাডভোকেট আবদুর রহিম ছিলেন সদর আসনের একাধিকবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য। ওই সময়ে দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব সামলে চলতে হয়েছে তাকে। দলের বিভক্তির সময় বাকশালের পক্ষে অবস্থান ছিল পরিবারটির। মূল দলে ফিরলেও বিষয়টি সহজভাবে নেননি কট্টরপন্থী নেতাকর্মীরা। বর্তমান সংসদ সদস্য ইকবালুর রহিম ছিলেন জাতীয় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক। পিতার সাথে পুত্রের ছিল একই মেরুর রাজনীতির সংশ্লিষ্টতা। পরে মূল দলে যুক্ত হলেও স্থানীয় নেতাকর্মীদের কাছে নিজেদের শক্ত অবস্থান গড়তে ব্যর্থ হয়েছে পরিবারটি। স্থানীয় রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্রের আশঙ্কায় হুইপ ইকবালুর রহিমের বিরোধীদের সংখ্যাই বেশি। ফলে তার সাথে মাঠে ও মঞ্চে শুধু দেখা মেলে যুব মহিলা লীগ এবং স্বেচ্ছাসেবক লীগের কিছু নেতাকর্মীর। মূল দলের অধিকাংশ নেতাকর্মী রয়েছেন মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমানের সাথে। তবে দলীয় কর্মকাণ্ডের পরিবর্তে নিজ নিজ আখের গোছাতে ব্যস্ত তারা। দিবসভিত্তিক দলীয় কর্মকাণ্ড চলছে চারদেয়ালের মধ্যেই। মাঠপর্যায়ে চোখে পড়ার মতো বড় ধরনের সভা-সমাবেশ করতে দেখা যায়নি দলটির স্থানীয় নেতাদের। বিভিন্ন মেলা এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে ফিতা কাটা ছাড়া মন্ত্রীকেও তেমন দেখা যায় না সাংগঠনিক কাজে। তার ঘনিষ্ঠজনদের মতে, মন্ত্রী দিনাজপুরের ফুলবাড়ী, পার্বতীপুর, বিরামপুর, নবাবগঞ্জ, হাকিমপুর ও ঘোড়াঘাট (৬) উপজেলা নিয়ে দক্ষিণ দিনাজপুর নামে পৃৃথক আরেকটি জেলা গঠন করতে চাইছেন। ওই এলাকার দু’টি কয়লাখনি এবং মধ্যপাড়ার পাথরখনি নিয়ে নতুন জেলায় মাইন সিটি গড়ার প্রতিশ্রুতি তার। এ কাজে অনেক দূর এগিয়েছেন তিনি। দিনাজপুরের পরিস্থিতি অনুভব করেই পৃথক জেলা গঠনের পর সাংগঠনিকভাবে তৎপর হওয়ার ইচ্ছে তার। তিনি টানা পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন ফুলবাড়ী-পার্বতীপুর আসনে। এ ব্যাপারে জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মীর্জা আশফাক হোসেন মন্ত্রী ও এমপির দ্বন্দ্বের প্রসঙ্গ এড়িয়ে বলেন, ‘প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী অ্যাডভোকেট মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার টানা ছয়বারের এমপি। নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বে ফিজারের সমক নন ইকবালুর রহিম।
বিএনপি : ১/১১-এর বিধ্বস্ত অবস্থা থেকে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি দিনাজপুর জেলা বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনগুলো। ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে পাঁচটিই পেয়েছিল চারদলীয় জোট। এর মধ্যে দু’টি আসন পায় শরিক দল জামায়াতে ইসলামী। অথচ এর পরের সংসদ নির্বাচনে একটি আসনও পায়নি তারা। ওই নির্বাচনে চারদলীয় জোট প্রার্থীদের পরাজিত করে ছয়টি আসনেই জয় পেয়েছে মহাজোট।
এ দিকে গত ৫ বছরে বিএনপির বেশির ভাগ নেতাকর্মী মামলায় জড়িয়ে এখন সবাই বাড়িছাড়া। মাঠপর্যায়ে দল গোছানো থাকলেও এ মুহূর্তে জাতীয় নির্বাচন হলে জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে কমপক্ষে চারটিতে প্রার্থী সঙ্কটে পড়তে হবে দলটিকে। যোগ্য প্রার্থীর অভাব রয়েছে। প্রার্থী সঙ্কটের কারণে ২০০১ সালে দিনাজপুর-১ ও ৬ আসন জামায়াতকে ছেড়ে দেয় বিএনপি। বিএনপির জেলা কমিটির সভাপতি ব্যবসায়ী লুৎফর রহমান মিন্টু বলেন, বর্তমানে সব ক’টি আসনেই জয় পাওয়ার অবস্থায় ঘুরে দাঁড়িয়েছে দল।
অন্য দিকে মূল দলের কমিটি গঠন করা হলেও অঙ্গসংগঠনের কাজ চলছে আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে। নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতে রূপ নেয়ার আগেই কমিটি গঠনের সমস্যা মিটে যাবে এমনটিই আশা করছেন দলটির স্থানীয় নেতারা। জেলা কমিটির সভাপতি লুৎফর রহমান মিন্টু বলেন, বর্তমান কমিটি ঐক্যবদ্ধ, নিজেদের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। দ সাংগঠনিক তৎপরতায় দলকে মাঠপর্যায়ে গুছিয়ে আনা হয়েছে। ফলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সফলতার মুখ দেখেছেন তারা। অন্য দিকে আওয়ামী লীগের অপকর্মে ভোটাররা বেছে নেন বিএনপি প্রার্থীদের।
জামায়াত : ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের রোষানলে পড়ে দিনাজপুরে ঘরছাড়া এখন জামায়াতের নেতাকর্মীরা। স্থানীয় জামায়াতের ওপর সারি থেকে শুরু করে ওয়ার্ড কমিটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেও শত শত মামলা রয়েছে।
জামায়াত সূত্রে থেকে জানা গেছে, দিনাজপুরের প্রতিটি উপজেলায় ৪০ থেকে ৫০টি করে মামলা রয়েছে। সেভাবে ১৩টি উপজেলায় মামলার সংখ্যা ৩ শতাধিক। এসব মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ১০ সহস্রাধিক। পুলিশের হামলা-মামলার পরও সম্প্রতি সাংগঠনিক পক্ষ পালন করছে জামায়াতে ইসলামী। এর আগেও দাওয়াতি পক্ষ পালন করে দলটি।