সিসি ডেস্ক: দুর্নীতির মামলায় বিচারিক আদালতে ১০ বছরের দণ্ডপ্রাপ্ত ফেনীর সাবেক এমপি জয়নাল হাজারীকে হাইকোর্টের দেয়া খালাসের রায় আপিল বিভাগ বাতিল করায় ফেনীতে ফের আলোচনায় জয়নাল হাজারী। বিতর্কিত এ নেতা একসময় জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে তিনি অনেকটা নির্বাসনে। ঢাকাতেই থাকেন তিনি। নিরাপত্তা হুমকি মনে করে দীর্ঘদিন আসেন না ফেনীতে।
এক সময়ের আলোচিত-সমালোচিত জয়নাল হাজারী ফেনী-দাগনভূঞা আসনের ৩ বার এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। বর্তমানে গুটি কয়েক ছাড়া তার সব অনুসারীই ফেনী-২ (সদর) আসনের এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন হাজারীর নেতৃত্বে চলছে। সোমবার উচ্চ আদালতের খালাসের রায় আপিল বিভাগ বাতিল করায় মঙ্গলবার দিনভর অধিকাংশ মানুষের মুখে মুখে ছিল জয়নাল হাজারীর নাম।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ফেনীর রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় রয়েছেন জয়নাল হাজারী। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তার বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের ফলে বরাবরই দেশে-বিদেশে আলোচিত-সমালোচিত ছিলেন এ ব্যক্তি।
এক সময়ের ফেনীর আলোচিত টাইগার বাহিনীর বিপরীতে তিনি ১৯৯৩ সালে ফেনীতে গঠন করেন স্টিয়ারিং কমিটি। পরে ১৯৯৬ সালে তার নাম পরিবর্তন করে ক্লাস কমিটি নাম রাখেন। জেলায় বিতর্কিত এসব কমিটির সদস্যদের ভয়ে অনেকটা আতংকে থাকতেন ফেনী জেলা মানুষ। জেলার ৪৩টি ইউনিয়নের প্রতিটি ওয়ার্ডে এসব কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সদস্য ছিলেন প্রায় ৫ হাজার। এ বাহিনীর নেতৃত্বে ফেনীতে একাধিক বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে স্থানীয়দের।
অনুষ্ঠানে দাওয়াত না দেয়ার অভিযোগ এনে ২০০১ সালের ১ জানুয়ারি জেলার দাগনভূঞার জায়লস্করের ওমরপুরে জাহানার মেমোরিয়াল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় তার নির্দেশে ক্লাস কমিটির লোকজন ভেঙে গুড়িয়ে দেয়। বার্তা সংস্থা ইউএনবিতে এ ঘটনার সংবাদ প্রকাশ করায় তৎকালীন ওই সংস্থার জেলা প্রতিনিধি টিপু সুলতানকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করা হয়।
ক্লাস কমিটির নেতৃৃত্বে ২০০১ সালের জানুয়ারিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে জেলার সোনাগাজীর চরইঞ্জিমানে নদী পথে গুলি চালানো হয় বিএনপির কর্মীদের ওপর। সেই আলোচিত চরইঞ্জিমান ট্র্যাজেটিতে প্রাণ হারান ৯ বিএনপি সমর্থক। পার্শ্ববর্তী নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ থেকে খালেদা জিয়ার জনসভা শেষে আসার পথে এ হামলার ঘটনা ঘটে।
এ ঘটনার দু’দিন পর বিএনপি অধ্যুষিত জেলার দাগনভূঞা সিন্দুরপুর ইউনিয়নের অলাতলীতে ঘটে আরেকটি ট্র্যাজেডি। বিতর্কিত স্টিয়ারিং কমিটির সশস্ত্র অভিযানে বসির, রিপন, ইসমাঈল নামে তিন শিশু গুলিতে প্রাণ হারায়। যা আলোচিত অলাতলী ট্র্যাজেডি হিসেবে। এ ঘটনার পর থেকেই অনেকটা জয়নাল হাজারীর অপ্রকাশ্য পতন শুরু হয়।
বরাবরই জয়নাল হাজারী আলোচনায় থাকতেন দেশের রাজনীতিতে। ২০০১ সালের ১৬ আগস্ট রাতে তৎকালীন যৌথবাহিনীর অভিযানের মুখে ফেনী শহরের মাস্টার পাড়ার বাসা ছেড়ে পালিয়ে যান হাজারী। হাজারীর অনুপস্থিতে ২০০৭ সালের ২০ জানুয়ারি বাতিল হওয়া নির্বাচনে হাজারীর ছোট বোন খোদেজা বেগমকে দলীয় মনোনয়ন দেয়া হয়। ১/১১-এর পর দুদকের মামলায় খোদেজা গ্রেফতার হন। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর জামিনে বেরিয়ে আসেন খোদেজা।
জয়নাল হাজারী পালিয়ে যাওয়ার পর ২২ মামলার আসামি হন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশে ফেরেন তিনি। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকায় বেশ দীর্ঘ দিন জেল খেটে জামিনে বের হন তিনি।
জামিনে বের হওয়ার পর ফেনী আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে পূর্বের সেই জায়গা ফিরে পাননি তিনি। জয়নাল হাজারীর শিষ্য নিজাম উদ্দিন হাজারীর চাপে পড়েন জয়নাল হাজারী ও তার অনুগতরা। নড়বড়ে অবস্থায় এক পর্যায়ে ঢাকা চলে যান জয়নাল হাজারী। পাশাপাশি দলীয় সভানেত্রীর নির্দেশে চুপ থাকেন এমন দাবি জয়নাল হাজারীর।
এর ফাঁকে একবার তার ফেনী শহরের মাস্টারপাড়া বাসায় বোমা হামলার ঘটনাও ঘটে। প্রায় ৬ বছর তিনি তেমন ফেনী আসেন না। ঢাকায় তার সম্পাদিত সাপ্তাহিক হাজারিকা ও হাজারিকা প্রতিদিন বের করার কাজে সময় দেন।
তার অনুপস্থিতে এক সময়কার তারই শিষ্য তার চাচাতো ভাই নিজাম উদ্দিন হাজারী ফেনী রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে নির্বাচনে ফেনী পৌরসভা মেয়র হন। পরবর্তী সময়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। গত বছর ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে নিজামউদ্দিন হাজারী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফেনী-২ আসনে এমপি নির্বাচিত হন।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনে ফেনীর ৩টি আসনে জয়নাল হাজারী মনোনয়ন নিয়ে আলোচনায় আসেন। যদিও ঋণ খেলাপির দায়ে মনোনয়নপত্রগুলো বাতিল হয়। এদিকে সোমবার দুদকের মামলায় জয়নাল হাজারীকে খালাস দিয়ে হাইকোর্টের দেয়া রায় বাতিলের বিষয়ে জয়নাল হাজারীর কাছের মানুষ হিসেবে পরিচিত কেন্দ্রীয় যুবলীগের সহ-সম্পাদক অ্যাডভোকেট এম. শাহজাহান সাজু জানান, আশা করি আপিল বিভাগে মামলাটি পুনঃশুনানি হলেও জয়নাল হাজারী খালাস পাবেন।
উল্লেখ্য, ঘোষিত আয়ের বাইরে সম্পদ থাকার মামলায় ফেনীর সাবেক এমপি জয়নাল হাজারীকে হাইকোর্টের দেয়া খালাসের রায় বাতিল করেছেন আপিল বিভাগ। সোমবার হাইকোর্টে নতুন করে এ মামলার আপিল শুনানির নির্দেশ দিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত।
জয়নাল হাজারীকে খালাস দিয়ে হাইকোর্টের দেয়া রায়ের বিরুদ্ধে দুদকের করা লিভ টু আপিল নিষ্পত্তি করে প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বিভাগ এ আদেশ দেন।
গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ২০০৭ সালের ২ অক্টোবর জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ফেনী থানায় আওয়ামী লীগ নেতা হাজারীর বিরুদ্ধে এই মামলা করেন দুদকের উপপরিচালক সফিকুর রহমান ভূঁইয়া। এতে হাজারীর কাছে ঘোষিত আয়ের বাইরে ১ কোটি ১৩ লাখ ৩৯ টাকার সম্পদ থাকার কথা বলা হয় এবং তিনি নিজের এক কোটি টাকা বোনের নামে এককালীন আমানত হিসেবে সংরক্ষণ করেছেন বলে অভিযোগ আনা হয়।
২০০৮ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার বিশেষ জজ আদালত এ মামলার রায়ে হাজারীকে ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা; অনাদায়ে আরো তিন মাসের কারাদণ্ড দেয়। তার সম্পদ থেকে এক কোটি টাকা বাজেয়াপ্ত করারও আদেশ হয়।
ওই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন হাজারী। ২০১১ সালের ৫ ডিসেম্বর হাইকোর্ট তার আপিল মঞ্জুর করে সাজার রায় বাতিল করে।
দুদক এর বিরুদ্ধে ২০১২ সালের ১৪ এপ্রিল লিভ টু আপিল করে, যার শুনানি শেষে সোমবার সর্বোচ্চ আদালত আদেশ দিল।