সিসি ডেস্ক: জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের গত ১৫ দিনে তিন ধরনের বক্তব্যে বিভ্রান্ত হয়েছেন জাপার নেতাকর্মীরা। এমন কথা জানিয়েছেন জাপার শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে তৃণমূল নেতাকর্মীরা।
২০০০ সালের পর থেকে রাজনীতির মাঠে সকালে এক ধরনের বক্তব্য, বিকেলে সেই কথা থেকে সরে এসে নতুনভাবে আরেক কথা বলা যেন সাবেক রাষ্ট্রপতির নিত্যনতুন রুটিনে পরিণতি হয়। এমন মন্তব্য দলটির শীর্ষ পর্যায়ের বেশ কয়েক নেতার। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তারা বলেন, রাজনীতিতে দর্শন না থাকলে দল ও দলের প্রধানের প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ও ভক্তি নষ্ট হয়ে যায়। দেশের জন্য যা অমঙ্গল হয়। সে কারণে একটা সময় দলের অস্তিত্বও হারাতে পারে এমন আশঙ্কাও তাদের।
২৩ অক্টোবর উপজেলা দিবসে রাজধানীর কাকরাইলে পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত দলীয় এক সমাবেশে স্থানীয় নির্বাচন দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হওয়ার ঘোষণা আসলে বিরোধিতা না করে সরকারকে নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করার আহ্বান জানান এরশাদ। তার তিনদিন পর ২৬ অক্টোবর টাঙ্গাইলে জেলা জাতীয় পার্টির দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে তিনি বলেন, স্থানীয় নির্বাচন দলীয় ব্যানারে করা হলে সারাদেশে পরিবারের মধ্যে রক্তের হোলি খেলা শুরু হবে। এ নির্বাচন দুরভিসন্ধি। নীলনকশার নির্বাচন করে সরকার ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে চায়। তিনি সে সময় আরো অভিযোগ করে বলেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশন একটি মেরুদণ্ডহীন কমিশন। এ নির্বাচন কমিশন দিয়ে আজিজ মার্কা নির্বাচন দেশের জনগণ মেনে নেবে না। এমন সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে সরে আহ্বান জানান জাপা চেয়ারম্যান।
এমন মন্তব্যের এক সপ্তাহ পর আবারো সুর পাল্টে ৩ নভেম্বর এরশাদ আসন্ন পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে দলের সব জেলা ও উপজেলা কমিটির প্রতি নির্দেশ দেন। যথাশিগগিরই পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আগ্রহী প্রার্থীদের তালিকা প্রণয়ন করারও আহ্বান জানান। একইভাবে জেলা কমিটিসমূহকে স্ব-স্ব জেলার প্রত্যেক উপজেলা ও পৌরসভা থেকে প্রস্তাবিত তালিকা গ্রহণ করে ২০ নভেম্বরের মধ্যে পার্টির চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে জমা দেয়ার অনুরোধও জানান প্রধানমন্ত্রীর এ বিশেষ দূত।
১৫ দিনের ব্যবধানে তিন ধরনের বক্তব্যে বিভ্রান্ত হয়েছেন দলীয় নেতাকর্মীরা। কয়েক নেতা বলেন, এরশাদের কথা কোনটা সঠিক আবার কোনটা বেঠিক তা বোঝা মুশকিল। এ ব্যাপারে জাপার এক প্রেসিডিয়াম সদস্য বলেন, এরশাদের একেক সময় এক কথা বলার মধ্যে চলছে রাজনীতি। তিনি বলেন, এসব কারণে ম্যাডাম রওশন তাকে অপছন্দ করেন। এ নেতা আরো বলেন, রওশন এরশাদ যেই কথা বলেন সেই কথা রক্ষা করেন, যা বলবেন না তা তিনি করবেন না এবং চুপ থাকবেন। এটা হচ্ছে এরশাদ ও বিরোধীদলীয় নেতা রওশনের মধ্যে পার্থক্য।
এদিকে ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে ও পরে একের পর এক এরশাদের নাটক, মঞ্চের অভিনেতার মতোই চলছে অবিরামভাবেই। দ্বৈত অবস্থানে থেকে জš§ দিচ্ছেন নানা নাটকীয়তার। জাতীয় পার্টি সরকারে আছে। বিরোধী দলেও আছে। একই সঙ্গে এরশাদ সরকারের প্রশংসাও করছেন। কখনো কখনো সরকারের ভাষায় সাবেক বিরোধী দলের সমালোচনা করছেন। আবার কখনো তারা সরকারের সমালোচনায় মুখর হচ্ছেন তিনি। এছাড়া এরশাদ বিগত ২ বছরে একাধিক অনুষ্ঠানে বলেছেন, যে সরকার জনগণের নিরাপত্তা ও সুশাসন দিতে পারে না সেই সরকারের ক্ষমতায় থাকার কোনো অধিকার নেই। ব্যর্থ সরকারের বিরুদ্ধে তারা প্রয়োজনে রাজপথে নামবেন। পাশাপাশি দলীয় নেতাকর্মীদের সরকারের ব্যর্থতা এলাকায় গিয়ে তুলে ধরার নির্দেশ দেন।
এমন দ্বৈত ভূমিকার কারণে জাতীয় পার্টি এখন অনেকের কাছে হাসির পাত্র। দলের নেতাদের এমন আচরণে ক্ষুব্ধ, হতাশ তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। তৃণমূলই ছিল এক সময় এরশাদের রাজনীতির কেন্দ্র এখন সেই তৃণমূলেই তিনি সমর্থনহীন। দল এবং নিজের জনপ্রিয়তা তলানিতে চলে আসছে বলে জানিয়েছেন জাপার বেশ কয়েকটি জেলার নেতাকর্মীরা। তারা বলেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর এরশাদের একের পর এক ডিগবাজির নাটকীয় আচরণ ও ঘটনাক্রম খাদের কিনারে দাঁড় করিয়েছে পার্টিকে।
অপরদিকে দলের নেতারা দলকে পুনর্গঠনের কথা বললেও ক্রমে তৃণমূলে অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ছে এরশাদের হাতে গড়া এই দল। দলের নেতাদের দ্বৈত ভূমিকার কারণে দলে এবং বাইরে জাতীয় পার্টিকে নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা সন্দেহ ও সংশয়। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে এরশাদ একাধিকবার বলেছিলেন, নির্বাচনও করবো না, শপথও নেবো না। রওশনের নেতৃত্বে তার দলের একটি অংশ নির্বাচনে অংশ নেয়। একজন মন্ত্রী, দু’জন প্রতিমন্ত্রী হন। আর নানা নাটকীয়তার পর এরশাদ এমপি হিসেবে শপথ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হয়ে বাসায় ফেরেন। সম্প্রতি এরশাদ আরো বলেছিলেন, যে কোনো সময় জাপার তিন মন্ত্রী মন্ত্রিপরিষদ থেকে পদত্যাগ করতে পারেন। তার কিছুদিন পরেই আবার সেই অবস্থান থেকে সরে এসে এরশাদ বলেন, সময়-সুযোগ মতো মন্ত্রীরা পদত্যাগ করবেন। তার এক সপ্তাহ পরে রওশন এরশাদ একটি অনুষ্ঠানে জাপা চেয়ারম্যান এরশাদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেছিলেন, পূর্ণাঙ্গ বিরোধী দল হিসেবে জাপাকে রাজপথে অবস্থান করতে হলে মন্ত্রীদের পদত্যাগ করতে হবে।
এরশাদের এমন ধরনের বক্তব্যের ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী জিএম কাদের বলেন, এটি ওনার ব্যাপার। আমি কিছুই জানি না। তিনি বলেন, দলীয়ভাবে স্থানীয় নির্বাচন ভুল সিদ্ধান্ত। আমি মনে করি, এ নির্বাচন দেশের ভবিষ্যতের জন্য ভালো হবে না।