সিসি ডেস্ক: দল নয় নিজেদের আখের গোছানোয় মহা ব্যস্ত এখন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন জেলা ও মহানগরের নেতারা। ঠিকাদারি-টেন্ডারবাজি, দখল, তদবির করে সম্পদের পাহাড় গড়াই যেন তাঁদের একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান। এ কাজে অনেকটা বেপরোয়া নেতারা প্রয়োজনে দলের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বাধাতেও দ্বিধা করছেন না। এতে তৃণমূলে সরকারের ভাবমূর্তি মারাত্মক ক্ষুণ্ন হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় খোঁজ নিয়ে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
তবে দল ক্ষমতায় থাকাকালে ব্যবসা-বাণিজ্য করে জেলা নেতাদের বিত্তবান হওয়া দোষের নয় বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় একাধিক নেতা। দলটির সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন বলেন, ‘রাজনীতিবিদদের ব্যবসা-বাণিজ্য দোষের কিছু নয়। ক্ষমতায় থাকাকালীন সম্পদ বাড়াও অপরাধ নয়। তবে অনৈতিক পন্থায় তা করা হয়েছে কি না সেটিই দেখার বিষয়। জেলা নেতারা যদি অন্যায় পথে সম্পদের মালিক হতে চান তবে তা গ্রহণযোগ্য নয়।’
আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক হাছান মাহমুদ বলেন, ‘ব্যবসা-বাণিজ্য করার অধিকার সবার আছে। কিন্তু সরকার বা আমাদের দল কখনোই অনৈতিক কিংবা অবৈধ ব্যবসা-বাণিজ্যকে সমর্থন করে না। আর আমাদের দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অনেক সময় ঢালাও অভিযোগ আনা হয়, যা খতিয়ে দেখলে এর অনেক কিছুরই সত্যতা মেলে না।’
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় এক নেতার আশীর্বাদে ২০০৮ সালে রংপুর কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংকের সভাপতি হন রংপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তুষার কান্তি মণ্ডল। পরে তিনি রংপুর ভূমি বন্ধকি সমবায় ব্যাংকেরও সভাপতি হন। এসব পদের পুরো ফায়দা তুলেছেন তিনি। এক যুগেরও বেশি ভাড়া বাসায় থাকলেও এখন শহরের গুপ্তপাড়ায় তিনতলা বাড়ি করেছেন। দলীয় পদ ব্যবহার করে এ নেতা খোলাবাজারে পণ্য বিক্রির (ওএমএস) ডিলারশিপও বাগিয়েছেন।
২০১৪ সালেও সমবায় ব্যাংক পরিচালনা কমিটির নির্বাচনে ফের সভাপতি প্রার্থী হন তুষার কান্তি। এরপর দলীয় প্রভাব খাটিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীদের অনেকের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করান তিনি। এ অভিযোগে সভাপতি পদপ্রার্থী ও গঙ্গাচড়া উপজেলা চেয়ারম্যান মজিবর রহমান প্রামাণিক জেলা সমবায় কার্যালয়ের যুগ্ম নিবন্ধকের দপ্তরে তুষার কান্তির নামে লিখিত অভিযোগ দেন।
সমবায় ব্যাংকের সভাপতি থাকাকালে তুষার কান্তি শহরের সমবায় মার্কেটে স্ত্রী ও মেয়ের নামে তিনটি দোকান বরাদ্দ নেন। করেন নানা ধরনের অনিয়মও। জেলা কৃষক লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক উমেশ চন্দ্র দাস অভিযোগ করে বলেন, ‘দোকান বরাদ্দ পেতে সমবায় ব্যাংকে এক লাখ ২৫ হাজার টাকা জমা দিয়েছি দুই বছর আগে। কিন্তু আমাকে দোকান দেওয়া হচ্ছে না। এখন টাকা চাইতে গেলে মামলার ভয় দেখান তুষার কান্তি।’ বিভিন্ন সময়ে সমবায় ব্যাংকের অর্থও নয়ছয় করেন তিনি। ২০১২ সালের আগস্টে ব্যাংকের ৯ জন পরিচালক তাঁর বিরুদ্ধে প্রায় অর্ধকোটি টাকা অনিয়মের অভিযোগ আনেন।
ব্যবসায়ীর টাকা লুটের অভিযোগও আছে তুষার কান্তির বিরুদ্ধে। বছর দুয়েক আগে আতোয়ার হোসেন তালুকদার নামের এক ব্যবসায়ী কোতোয়ালি থানায় মামলা দায়ের করে অভিযোগ আনেন, সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে তাঁর দোকানের তালা ভেঙে ৫১ লাখ টাকার সম্পদ লুট করেছেন তুষার কান্তি।
তুষার কান্তির কর্মকাণ্ডে দলীয় নেতাকর্মীরাও ক্ষুব্ধ। জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ব্যবসায়ী মোতাহার হোসেন মণ্ডল মওলা ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, ‘ছাত্ররাজনীতি থেকে এ পর্যন্ত উঠে এসেছি। অনেক বছর ব্যবসা করেও বাড়ি বানাতে পারলাম না। আর মহানগরের সাধারণ সম্পাদক, যাঁর কোনো ব্যবসা নেই, তিনি কী করে বাড়ি করেন? হিসাবেই তো মেলে না!’
অভিযোগগুলো প্রসঙ্গে তুষার কান্তি মণ্ডল বলেন, ‘সব অভিযোগই ভিত্তিহীন। একটি মহল আমার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার ষড়যন্ত্র করছে। আমি মহানগরের সাধারণ সম্পাদক, আবার সমবায় ব্যাংকের সভাপতি—এতে অনেকেই ঈর্ষান্বিত।’
ভবন নির্মাণ প্রসঙ্গে তুষার কান্তি বলেন, ‘দুই শতকের কিছু বেশি জায়গা নিয়ে আমি নিজের জন্য বাড়িটি করেছি। দীর্ঘদিন ভাড়াটিয়া হিসেবে থাকায় অনেকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেন। এ জন্য কষ্ট করে বাড়িটি বানিয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘সমবায় ব্যাংকের নির্বাচন নিয়ে মামলা হয়েছিল। সেটা সম্প্রতি আদালত খারিজ করে দিয়েছেন। আশা করি এপ্রিলে আমি আবার সমবায় ব্যাংকের দায়িত্ব নিতে পারব।’
রংপুর জেলা ও মহানগর কমিটির শীর্ষস্থানীয় অন্য নেতারাও নিজেদের আখের গোছানোয় ব্যস্ত। রংপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি সাফিউর রহমান পদ পাওয়ার আগে ছোটখাটো ব্যবসা করতেন। তিনি মহানগর সভাপতি হওয়ার পর ঠিকাদারিতে নাম লিখিয়েছেন। সরকারি দপ্তরগুলোতে এখন তাঁর বিশাল দাপট। গত বছরের ১৮ জুন অগ্রিম বিল না দেওয়ায় রংপুর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ বাদশা মিয়াকে তাঁর কার্যালয়ে পিটিয়ে জখম করেন তিনি।
গত বছরের ৩১ জুলাই পীরগঞ্জে আওয়ামী লীগের একটি সমাবেশে নেতাকর্মীদের যাতায়াতের জন্য জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের দপ্তরে চাঁদা চাইতে যান সাফিউর। চাঁদা না পেয়ে তাঁর নেতাকর্মীরা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রককে লাঞ্ছিতসহ কার্যালয়ের চেয়ার-টেবিল ভাঙচুর করে। এ সংবাদ প্রকাশ করায় দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের রংপুরের নিজস্ব প্রতিবেদক শাহজাদা মিয়া আজাদকে হত্যার হুমকি দেন সাফিউর রহমান। এসব ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে সাফিউর রহমান বলেন, ‘যা শুনেছেন তা ভিত্তিহীন ও মিথ্যা।’
জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মমতাজ উদ্দিন আহমেদ বর্তমানে রংপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক। তিনি ওই পদ নিয়েই ব্যস্ত। দলীয় কাজে খুব একটা সময় দেন না। আর জেলা সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রাজু আইনজীবী পেশায়ই বেশি সময় দেন।
জেলা ও মহানগর নেতারা নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত থাকায় তৃণমূলের নেতাকর্মীরা চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসসহ বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে। গত এক বছরে তাদের হাতে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয় শিক্ষক ও ১২ শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। কয়েক বছর আগে রংপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সদর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করে কয়েকজন নেতাকর্মী।
মাদারীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজল কৃষ্ণ দে দল ক্ষমতায় আসার আগে থাকতেন একটি টিনের ঘরে। গত কয়েক বছরে তাঁর অর্থনৈতিক অবস্থার প্রভূত উন্নতি হয়েছে। এখন তিনি শহরের টরমুগরিয়া এলাকায় বহুতল ভবন নির্মাণ করছেন। নির্মাণাধীন পাঁচতলা ভবনটির দ্বিতীয় তলার কাজ শেষ হয়েছে।
স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানায়, টেন্ডারবাজি, দলের পদ ও মনোনয়ন বাণিজ্য করে কাজল দে রাতারাতি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। সরকারের গত মেয়াদে এলজিইডির একটি টেন্ডার নিয়ে দ্বন্দ্বে কাজল কৃষ্ণ দে প্রতিপক্ষের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছিলেন।
দলীয় প্রভাব কাজে লাগিয়ে আয়-উন্নতিতে মাদারীপুর জেলার সভাপতি সাহাবুদ্দিন মোল্লাও কম যান না। গত কয়েক বছরে তিনিও অঢেল বিত্তের মালিক হয়েছেন। ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের রাজৈর উপজেলার টেকেরহাট বন্দর এলাকায় নিজের নামে বহুতল মার্কেট তৈরি করছেন।
ঠিকাদারিতে যুক্ত সাহাবুদ্দিন মোল্লার এসএস কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বছরখানেক আগে মাদারীপুর জেলখানা নির্মাণের কাজ ৭০ শতাংশ বাকি রেখেই অতিরিক্ত বিল এবং পারফরম্যান্স সিকিউরিটি ও জামানতের পুরো টাকা তুলে নেন তিনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা আওয়ামী লীগের একজন নেতা বলেন, ‘সুবিধাবাদী সাহাবুদ্দিন মোল্লা চারদলীয় জোট আমলে হাওয়া ভবনে নিয়মিত যেতেন। তিনি সে সময়েও অনেক ব্যবসা বাগিয়ে নিয়েছেন।’
ওই দুই নেতার বিরুদ্ধে দলীয় মনোনয়ন বাণিজ্যেরও অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি পৌরসভা নির্বাচনের আগে কালকিনি উপজেলা আওয়ামী লীগ এক সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ জানায়, সাহাবুদ্দিন মোল্লা ও কাজল কৃষ্ণ দে এক কোটি টাকার বিনিময়ে তৃণমূলের মত উপেক্ষা করে এনায়েত হোসেন হাওলাদারকে মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন পাইয়ে দেন।
তবে এসব অভিযোগ মাদারীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দুজনই অস্বীকার করেছেন। জানতে চাইলে সাহাবুদ্দিন মোল্লা বলেন, ‘আগে আমার পরিচয় একজন ব্যবসায়ী, এরপর আমি নেতা। ১৯৭৭ সাল থেকে ব্যবসা করছি। ব্যবসা করেই সম্পদ করেছি।’
মাদারীপুর কারাগারের কাজে অনিয়ম প্রসঙ্গে সাহাবুদ্দিন মোল্লা বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ মিথ্যা। আমার লাইসেন্সে মাদারীপুরের আরেক ব্যবসায়ী কাজটি নেন।’ মনোনয়ন বাণিজ্য ও হাওয়া ভবনে যাতায়াতের বিষয়টিও অসত্য বলে মন্তব্য করেন তিনি।
দল ক্ষমতায় আসার আগে টিনের ঘর আর এখন পাঁচতলা ভবন নির্মাণ—অর্থনৈতিক অবস্থার এমন দৃশ্যমান পরিবর্তন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কাজল কৃষ্ণ দে বলেন, ‘আমি সাতাশি সাল থেকে ঠিকাদারি করি। পৈতৃক সূত্রে অনেক সম্পদ পেয়েছি। দল ক্ষমতায় আসার সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই।’ পৌরসভা নির্বাচনে মনোনয়ন বাণিজ্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কতিপয় নেতাকর্মী এসব মনগড়া কেচ্ছা-কাহিনী ছড়াচ্ছে। কেউ এ অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ করতে পারলে পদত্যাগ করব।’
যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদার পুরো জেলায় আধিপত্য কায়েম করেছেন। সীমান্তের এ জেলাটিতে চোরাচালান, সন্ত্রাস, টেন্ডারবাজি-ঠিকাদারিসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। দলীয় সূত্রগুলো জানায়, যশোরে চোরাচালান সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রক হাসান ও মিজান ক্রসফায়ারে মারা যাওয়ার পর এ সিন্ডিকেট এখন শাহীন চাকলাদারই নিয়ন্ত্রণ করেন। শাহীন চাকলাদারের আধিপত্য রক্ষায় তাঁর চাচাতো ভাই রেন্টু চাকলাদার, ফন্টু চাকলাদার, যশোর সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শাহারুল ইসলাম মাঠে নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন। তাঁদের বিরুদ্ধে যশোর থানায় বিভিন্ন সময়ে বহু মামলা হয়েছে।
স্থানীয় আওয়ামী লীগের সূত্রগুলো জানায়, শাহীন চাকলাদারের অনুসারীদের হাতে গত দুই-তিন বছরে দলের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী প্রাণ দিয়েছে। যশোর সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক রিপন হোসেন, শহর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি আব্দুল মান্নান, বাস্তুহারা লীগের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মুঞ্জুর রশীদ হত্যায় শাহীন চাকলাদারের অনুসারীদের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে শাহীন চাকলাদারের মোবাইল ফোনে কয়েকবার কল করা হলেও তিনি তা ধরেননি।
দলীয় সূত্রগুলো জানায়, খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি তালুকদার আব্দুল খালেক, সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মিজান, খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হারুনুর রশিদ ও সাধারণ সম্পাদক এস এম মোস্তফা রশিদী সুজা প্রত্যেকেই আলাদা কর্মী বলয় তৈরি করেছেন। দলকে সংগঠিত করার চেয়ে অনুসারীদের নিয়ে প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করার দিকেই তাঁরা মনোযোগী।
খুলনা জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠনের নেতারা দলীয় কর্মকাণ্ডের চেয়ে ঠিকাদারি ও টেন্ডারবাজিতে বেশি মনোযোগী। দায়সারাভাবে বিভিন্ন দিবসের কর্মসূচি পালনের বাইরে তাঁদের কোনো সাংগঠনিক তৎপরতা নেই। সূত্রগুলো জানায়, মহানগর আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী একাধিক নেতার সহযোগিতায় যুবলীগের কয়েক নেতা গত বছরের ২৪ মার্চ খুলনা ওয়াসার ১৫ কোটি এবং ৩১ মার্চ অর্ধকোটি টাকার কাজ নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে নেন। একইভাবে ৩ জুন খুলনা বিভাগীয় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ১০ কোটি টাকার কাজ, ৬ জুন ওয়াসার তিন কোটি টাকার কাজ ভাগ-বাটোয়ারা করা হয়। এর আগে ১৩ মে খুলনা সিটি করপোরেশনের ২২ কোটি টাকার কাজ স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন।
রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী, মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন ও সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার ব্যস্ত আছেন নিজেদের নিয়ে। তাঁরা নগরীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঠিকাদারি-টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন বলে অভিযোগ আছে।
পিরোজপুরের সভাপতি এ কে এম আউয়াল নিজ এলাকায় পারিবারিক সাম্রাজ্য গড়ায় মনোনিবেশ করেছেন। ঠাকুরগাঁও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি দবিরুল ইসলাম ভূমি দখল, সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের কারণে দেশব্যাপী কুখ্যাতি অর্জন করেছেন। নাটোরে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম শিমুল এমপির বিরুদ্ধেও টেন্ডারবাজি ও দলীয় প্রতিপক্ষকে নিপীড়নের অভিযোগ রয়েছে। কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খান ও সাধারণ সম্পাদক আজগর আলীর বিরুদ্ধে টেন্ডারবাজি ও সরকারের চাল-গম সংগ্রহ অভিযান থেকে কমিশন আদায়সহ নানা অপকর্মের অভিযোগ আছে। পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম ফারুক প্রিন্স, জয়পুরহাট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এস এম সোলায়মানের বিরুদ্ধেও দখল, টেন্ডারবাজির অভিযোগ রয়েছে।
‘আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগে রিকশা আর ভ্যানে চলাচল করেছেন, এখন অর্ধশত কোটি টাকার মালিক। মাওনা চৌরাস্তার পাশেই কোটি টাকার বিশাল বাড়ি বানাচ্ছেন। পরিবারের সবার গাড়ি আছে। এর সবই তিনি করছেন দলের পদপদবি ব্যবহার করে’—সম্প্রতি সরেজমিনে শ্রীপুর উপজেলায় গেলে স্থানীয় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান বুলবুলের উত্থান সম্পর্কে এসব মন্তব্য করে তাঁর নিজ গ্রামের বাসিন্দারাই।
বুলবুলের বলার মতো কোনো ব্যবসা ছিল না, এখনো নেই। কখনো চাকরি করেননি। পূর্বপুরুষদের পৈতৃক সম্পত্তিও তেমন ছিল না। কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে বদলে যায় তাঁর অবস্থা। গত সাত বছরে দলের উপজেলা সাধারণ সম্পাদকের পদ ব্যবহার করে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন তিনি। মাওনা চৌরাস্তায় ও গাজীপুরে কয়েক কোটি টাকায় দুটি অট্টালিকা বানিয়েছেন। রয়েছে উত্তরায় ফ্ল্যাট। এ ছাড়া নামে-বেনামে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে রয়েছে তাঁর আরো অনেক জমিজমা। শুধু তিনিই নন, উপজেলা থেকে শুরু করে পৌর আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ওয়ার্ড পর্যায়ের কমিটির শতাধিক নেতা দলের পদপদবি ব্যবহার করে কোটিপতি হয়েছেন। সম্পদের পাহাড় গড়েছেন শ্রীপুর পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ নজরুল ইসলামও। এলাকায় তিনি ইয়াবা ব্যবসাও নিয়ন্ত্রণ করেন।
সাভার উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলী হায়দার ২০০৯ সালের আগেও রিকশায় চলাচল করতেন। তিনিই এখন কোটি টাকার প্রাডো গাড়িতে চড়েন এবং থাকেন বিলাসবহুল বাড়িতে। সাভার ও আশুলিয়ায় ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে, জমি দখল, টেন্ডারবাজিসহ নানাভাবে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন তিনি।