সিসি ডেস্ক: রাঘব বোয়ালদের কাছে হাজার কোটি টাকা ঋণ বকেয়া থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না। অথচ দরিদ্র, ভূমিহীন ও প্রান্তিক কৃষক মাত্র ২০-২৫ হাজার টাকার ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিচ্ছে ব্যাংক। এ ব্যাপারে মামলা না করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। গত তিন মাসে নতুন করে ১৫১ কৃষক পড়েছেন মামলার জালে। আর অনাদায়ী ঋণের জন্য এ পর্যন্ত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে ঘর ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন সাড়ে ১২ হাজার কৃষক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারাদেশে অনাদায়ী কৃষিঋণের জন্য ১ লাখ ৯৯ হাজার ৯৮ কৃষকের বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট মামলা রয়েছে। তাদের কাছে (মে পর্যন্ত) ব্যাংকগুলোর পাওনা প্রায় ৫৬৭ কোটি ২২ লাখ টাকা টাকা। আর মাত্র এক কোটি ২৩ লাখ টাকার অনাদায়ী ঋণের জন্য ১৫১ কৃষকের বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে ব্যাংক।
প্রসঙ্গত, অন্য খাতের ঋণ ছয় মাস মেয়াদোত্তীর্ণ হলে তা খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হয়। কৃষিঋণ এক বছর মেয়াদোত্তীর্ণ হলে তাকে খেলাপি বলা হয়। কৃষিঋণ তিন বছর বকেয়া থাকলে গ্রহীতার বিরুদ্ধে মামলা করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, কৃষকদের বিরুদ্ধে এই ধরনের সার্টিফিকেট মামলা করার আইন থাকা উচিত নয়। তাদের মতে, হাজার কোটি টাকা কোনো ব্যক্তি বা গ্রুপ আটকে রাখলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় না ব্যাংক। অথচ মাত্র ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকার জন্য কৃষকদের পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে তাদের ঋণ মওকুফ করা উচিত বলে মনে করেন তারা।
কৃষকের বিরুদ্ধে নতুন মামলা কেন জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর চৌধুরী বলেন, তাদের নির্দেশনার পর কৃষকের বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট মামলা দায়ের কমে এসেছে। আগে ঢালাওভাবে মামলা দায়ের করা হলেও এখন তা হচ্ছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মামলা তুলে নিতে, হয়রানি বন্ধে ও পারতপক্ষে মামলা না করার নির্দেশ দিয়েছে। বিশেষ ক্ষেত্রে ব্যাংক হয়তো মামলা করেছে। তবে নতুন মামলার বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক খতিয়ে দেখবে। যেসব ব্যাংকের বিরুদ্ধে নতুন মামলা করার অভিযোগ পাওয়া যাবে পরবর্তী বৈঠকে কারণ জানতে চাওয়া হবে।
২০১৩ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত টানা রাজনৈতিক সহিংসতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ে কৃষক। টানা হরতাল-অবরোধে মহাসড়কগুলোতে হামলার শিকার হয় পণ্যবাহী গাড়ি। সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় দেশের নানা প্রান্ত থেকে সময়মতো ঢাকায় পণ্য পাঠাতে না পারায় ফসলের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন কৃষক। ফসলের টাকা তুলতে না পেরে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েন তারা।
কৃষকের এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আপসরফার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত খাতের ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠকে বসে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই বৈঠকে কৃষকের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির পাশাপাশি নতুন মামলা না করার নিদের্শনা দেয়া হয়। কিন্তু এ নির্দেশনার পরও কৃষকের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিয়েছে জনতা ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক।
এদিকে সাম্প্রতিক সময় ফের প্রাকৃতিক দুর্যোগের স্বীকার হয়েছেন কৃষকসমাজ। টানা বৃষ্টি ও বন্যার পানিতে ২১ জেলার প্রায় আড়াই লাখ হেক্টর জমির আউশ ও আমন ধান তলিয়ে আছে। ডুবে আছে প্রায় ১২ হাজার হেক্টর জমির সবজি। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা ১২ লাখের বেশি। এ হিসাব কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের।
অধিদপ্তরের আশঙ্কা, পানিতে ডুবে থাকা জমির সবজির ৯০ শতাংশই (প্রায় ৫০ হাজার টন) নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া পুকুর ও মাছের খামার ভেসে যাওয়ায় মাছচাষিরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সবজির ক্ষতির প্রভাব ইতোমধ্যে বাজারে পড়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বেশির ভাগ এলাকায় সব ধরনের সবজি ও পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। কাঁচা মরিচ ২০০ থেকে ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
গত ২০ আগস্ট থেকে টানা বৃষ্টি ও বন্যায় পর্যায়ক্রমে এসব জমি তলিয়ে যায়। কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তর বলেছে, এর আগে জুনে অতিবৃষ্টিতে বিভিন্ন এলাকার প্রায় ১ লাখ ৫৭ হাজার হেক্টর জমির ফসল ডুবে যায়। এর মধ্যে ৩৯ হাজার ১০২ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়। গত বছর ২৪ জেলায় বন্যায় কৃষকের ক্ষতি হয়েছিল। প্রকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগের কারণে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছেন কৃষক। সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় মামলা থেকেও রেহাই পাচ্ছে না তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্টরা জানান, সামান্য টাকার জন্য ২ লাখের বেশি মামলা নিয়ে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক উদ্বিগ্ন। অবশ্য আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে এসব মামলা হয়েছে। তবে এখন থেকে ব্যাংকগুলোকে এমন পদ্ধতি অনুসরণ করতে বলা হয়েছে, যাতে পারতপক্ষে সার্টিফিকেট মামলা না করতে হয়, আবার কৃষকরা খেলাপিও না হন। এজন্য ঋণ আদায় জোরদার, ঋণ পরিশোধ উৎসাহিত করতে অঞ্চলভিত্তিক পুরস্কারের আয়োজন, যথাসময়ে ঋণ পরিশোধের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সচেতনতা বাড়ানো, ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত কৃষককে ঋণ দেওয়া ও প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে পুনঃতফসিল করে মেয়াদ বাড়াতে বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কৃষকের বিরুদ্ধে মামলা ও সবচেয়ে বেশি বকেয়া রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের (বিকেবি)। এ পর্যন্ত ব্যাংকটির কৃষি ঋণ খেলাপির পরিমাণ ২৬২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। এজন্য ব্যাংকটি মামলা করেছে ৮৮ হাজার ৬৩২ জন কৃষকের বিরুদ্ধে। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন ৫ হাজার ৪০৯ জন।
মামলা করার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে অগ্রণী ব্যাংক। এ পর্যন্ত ব্যাংকটি ৫৪ কোটি ২০ লাখ টাকার জন্য মামলা করেছে সাড়ে ৩৪ হাজার কৃষকের বিরুদ্ধে। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে এক হাজার ২৯৫ জনের বিরুদ্ধে।
আঞ্চলিক ব্যাংক রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের মামলা রয়েছে ৩২ হাজার ২০২ কৃষকের বিরুদ্ধে। তাদের কাছে পাওনা ১৫২ কোটি ২ লাখ টাকা। কৃষকের বিরুদ্ধে মামলা করায় ব্যাংকটি তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। পরোয়ানা রয়েছে ২ হাজার ৬৬৩ জনের বিরুদ্ধে।
৫০ কোটি ৯৫ লাখ টাকা পাওনা আদায়ে ২১ হাজার ৫০৪ জন কৃষকের বিরুদ্ধে মামলা করেছে সোনালী ব্যাংক। মামলা করার ক্ষেত্রে ব্যাংকটি চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে ৩৬০ জনের বিরুদ্ধে।
৪১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা আদায়ের জন্য জনতা ব্যাংক মামলা করেছে ১৮ হাজার ৯৭৭ জন কৃষকের বিরুদ্ধে। পরোয়ানা রয়েছে এক হাজার ৬৯৬ জনের।
কৃষকের কাছে রূপালী ব্যাংকের পাওনা ৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। এ পর্যন্ত ব্যাংকের পক্ষ থেকে ৩ হাজার ৩৩৬টি মামলা করা হয়েছে। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে ৩৮৯ জনের বিরুদ্ধে।