।। অনন্য আমিনুল ।। কালের ধারা বিবর্তনের সাথে সময়ের প্রয়োজনে বিদেশী ভাষা থেকে যে ভাবে বাংলা ভাষায় বিভিন্ন শব্দ সংযোজিত হয়েছে, ঠিক তেমনি বিদেশী সাহিত্য থেকে বাংলা সাহিত্যে বিশেষ করে ছড়া ও কবিতা শাখায় নানা ধারার ছন্দ স্থান দখল করে নিয়েছে। যার মধ্যে ইতালির কবি পেত্রার্ক-এর ‘সনেট’, ইংল্যান্ডের কালজয়ী কবি এডওয়ার্ড লিয়রের ‘লিমেরিক’, জাপানের ম্যাসুও বাশোকের ‘হাইকু’ ইরানের ‘রেখতা’, সংস্কৃত ভাষার ‘মান্দাক্রান্ত’, পয়ার, ত্রিপদী, ছাড়াও অন্যান্য ‘লিমেরাইকু’, ‘ট্রায়োলেট’, ‘ক্লেরিহিউ’, ‘ব্যালার্ড’, ‘আইডেন্টিকাল রাইম’, ‘লিওনাইন ভার্স’ ও ‘রঁদো’ বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। আর এসব ছন্দ ধারা কখনও কারও হাত ধরে আবার কখনও প্রাকৃতিক ভাবে বাংলা সাহিত্যে প্রবেশ করেছে। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে দেখা গেছে, জাপানের ম্যাসুও বাশোকের আলোচিত ‘হাইকু’ ১৯১৬ সালে বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ইটালির কবি পেত্রার্ক-এর কবিতা লেখার ধারা ‘সনেট’ (চতুষ্পদী কবিতা) ইংরেজি সাহিত্যে নিয়ে আসেন শেক্সয়িপয়ার এবং ইংরেজি ‘সনেট’ থেকে বাংলা সাহিত্যে নিয়ে আসেন মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। অপরদিকে জাপানের ‘ফুকুওয়া’ ছন্দের ধারা ‘পিয়ানোর ছন্দ’ নামে বাংলা সাহিত্যে রূপ লাভ করেছে ছন্দের যাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের হাত ধরে।
আমরা দীর্ঘ দিন ধরে ছন্দের এসব বিদেশী পদ্ধতি অনুসরণ করে ছড়া কবিতা লিখছি। বিশেষ করে ছড়ায় স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্তে দ্রুত লয় ও মধ্য লয়ের ছড়া লিখে চলছি। তবে বাংলা ছড়ায় এসব পুরাতন আদল পাল্টিয়ে অনেকে অনেক ভাবে ছড়া লিখেছেন। যাদের মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় শিশু সাহিত্যিক সুকুমার রায় ‘ভারতীয় ননসেন্স’, মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত ‘অমিত্রাক্ষর’, বিদোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ‘মুক্তক’, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘সমিল মুক্তক’ সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ‘স্বরাক্ষরিক’, গিরিশচন্দ্র’র ‘গৈরিশ’ ছন্দের প্রতবর্তন করেন। এছাড়াও বর্তমান সময়ে পশ্চিম বঙ্গের ছড়াকার ও ছড়া গবেষক সতীশ বিশ্বাস ১৯৯৫ সালে লিমেরিক লিখতে গিয়ে ছয় লাইনের এক ছত্র ছড়াতে নতুন রূপ এনেছেন এবং নাম দিয়েছেন ‘ছড়াক্কা’ (ছড়া+ছক্কা)। বর্তমানে দুই বাংলার ছড়াকারগণএটির ব্যাপক চর্চা করছেন। ‘ছড়াক্কা’ ছাড়াও সতীশ বিশ্বাস ‘মধ্যমিল ছড়া’, ‘অন্ত্যমিল ছড়া’, ‘ত্রিভুজ ছড়া’ ও ‘মাকু ছড়া’ নামে বেশ কয়েকটি পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন। এতো গেলো ভারতীয় বাঙালীর কথা। আমি ভাষা যুদ্ধের দেশে জন্ম নেয়া একজন বাঙালি হিসেবে দীর্ঘ দিন ধরে ছড়া লেখার চর্চা করছি। আর সে নেশা থেকেই বাংলা সাহিত্যের ছড়া শাখায় পুরতান আদলে ছড়া লেখার পাশাপাশি একটি নতুন আদল প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছি। আমি গত গত ১৫/০৩/২০১৫ তারিখ ‘ইচ্ছে করে’ শিরোনামে একটি ছড়া লিখতে গিয়ে পাঁচ লাইনের একটি ছত্র লিখি। ছত্রটির দ্বিতীয় লাইনের সাথে পঞ্চম লাইনে অন্ত্যমিল রেখে তৃতীয় এবং চতুর্থ লাইনের পরস্পর অন্ত্যমিল রাখি। পরে ছড়াটিকে দুই ছত্রে রূপ দান করে প্রথম ছত্রে প্রথম লাইনের সাথে দ্বিতীয় ছত্রের প্রথম লাইনের অন্ত্যমিল রাখি এবং প্রথম ছত্রে তৃতীয় ও চতুর্থ এবং দ্বিতীয় ছত্রের তৃতীয় ও চতুর্থ লাইনের স্ব-স্ব অন্ত্যমিল রাখি। কিন্তু পদ্ধতিটির নামকরণ নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হলে বাংলা একাডেমীর জীবন সদস্য প্রধানমন্ত্রী পুরস্কার প্রাপ্ত বর্ণের জাদুকর দ্বিজেন্দ্র নাথ ব্যানার্জীর সাথে আলোচনা করি। তিনি নামকরণের বিষয়টি নিয়ে বিশদ ঘাটাঘাটি করতে বলেন। পরে ছড়াটির প্রথম ও দ্বিতীয় ছত্রে প্রথম লাইনের সাথে মিল রেখে আরেকটি ছত্র লিখে সেটিতেও দ্বিতীয়, পঞ্চম এবং তৃতীয় ও চতুর্থ লাইনের স্ব-স্ব মিল রেখে নতুন উদ্ভাবিত ছড়ার আদলটির নাম রাখি ‘ত্রিমিল’। যেমন- ত্রিমিল ছন্দের সূচনা ছড়া “ইচ্ছে করে” ইচ্ছে করে দুঃখ টুটে/কষ্ট রেখে দূরে/দুঃখগুলো বদল দিয়ে/একটু সুখের পরশ নিয়ে/কষ্ট রাখি মুড়ে। ইচ্ছে করে হাওয়ায় ছুটে/নীল আকাশে উড়ে/অনেক দূরের দেশ পেরিয়ে/সাত সমুদ্দুর শেষ পেরিয়ে/আসতে আবার ঘুরে। ইচ্ছে করে শান্তি লুটে/এই পৃথিবীজুড়ে/সবার সাথে চলতে গিয়ে/মনের কথা বলতে গিয়ে/হৃদয় বাঁধি সুরে। নতুন পদ্ধতিতে ছড়াটির প্রতিটি ছত্রের প্রথম, তৃতীয়, চতুর্থ লাইনগুলো আট মাত্রার হবে এবং দ্বিতীয় ও পঞ্চম লাইন বর্ণনা অনুসারে পাঁচ/ছয়/সাত মাত্রার হতে পারে। বর্তমানে পুরাতন আদলে ছড়া লেখার পাশাপাশি আমার উদ্ভাবিত ‘ত্রিমিল’ পদ্ধতিতে ছড়া লিখছি। আমি আশা রাখি নতুন এ আদলে ছড়া লিখলে অবশ্যই একদিন ছড়াগুলো বাংলা সাহিত্যের স্থান দখল করবে এবং ছড়া লেখার নতুন আদলটি বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার সাহিত্যে জায়গা করে নেবে।