মশিউর রহমান শান্ত : মাঝে মাঝে অদ্ভুত কিছু সময় আসে জীবনে । তখন ভালো মন্দ কিংবা উচিৎ অনুচিত কোন কিছুই মাথায় কাজ করে না । আমি সাধারণ মানুষ । তবে সাধারণ মানুষের থেকেও অনেক বেশী সাধারণ কারন আমার জীবনে রোমাঞ্চকর কোন কিছুই এখন পর্যন্ত ঘটেনি । প্রেম করে ছ্যাকা খাইনি । কখনো কারো সাথে মারা-মারি কাটা কাটি কিছুই হয়নি । কখনো এমন কোন বড় দুর্ঘটনাও ঘটেনি যা সারাজীবন মনে রাখব । তবে আমার মতো রস–কষহীন মানুষের জীবনে ব্যতিক্রম একটি গল্প কিংবা গল্পের মতোই সত্যিকারের কাহিনী পড়বার সুযোগ করে দিল বন্ধু নাফিজ আহসান । সে পেশায় সাংবাদিক । সারাদিনই ছুটো-ছুটির মধ্যে থাকে বলেই তার স্বভাব হচ্ছে সারাক্ষণ অস্থির হয়ে থাকা । কারনে অকারনে অস্থির হয়ে থাকা আমার এই বন্ধুটি হটাত একদিন তার বাসায় পড়ে থাকা পুরনো এক ডায়েরি আমার হাতে ধরিয়ে দিল । ডায়েরি দিয়ে হাসিমুখে বলল, লেখক সাহেব ডায়েরিটা পড়ে দেখবেন আমার মনে হয় ভালো লাগবে । বলা যায় না এটা নিয়ে গল্প কিংবা উপন্যাসও লিখে ফেলতে পারেন । অত্যন্ত আগ্রহের সাথে আমি হাসিমুখে ডায়েরি নিয়ে বললাম আজই বাসায় গিয়ে পড়ে ফেলব । কিন্তু বাসায় যখন ফিরলাম তখন আগ্রহ অনেকটাই ফিকে হয়ে গেল । বাসায় ফেরার পর সেই যে ডায়েরিটা আমার বুকসেলফে রেখেছি তা খুলে পড়বার মতো সময় কিংবা ইচ্ছা কোনটাই কেন জানি আর হল না । গল্প,উপন্যাসই এখন পড়বার তেমন সুযোগ হয় না সেখানে মানুষের লেখা ডায়েরি পড়ে সময় নষ্ট করাটা অর্থহীনই বলা যায় । সেই অর্থহীন কাজ করবার চাইতে দু-চার লাইন লিখে নতুন বইয়ের কাজগুলো এগিয়ে রাখাটা যুক্তি-যুক্ত মনে হল । আর ডায়েরিটি মাস দুয়েক সময় ধরে আমার বুক সেলফেই পড়ে রইল । হটাত দু-মাস পর কি একটা কাজে সিলেটে যাব । সাত-আট ঘণ্টার লম্বা ট্রেন জার্নি । এরকম লম্বা জার্নি করতে হলে আমি বরাবরই কয়েকটা বই নিয়ে নিই যাতে জার্নিটা বোরিং না লাগে । তবে এবার কেন জানি একটু ব্যতিক্রম হয়ে গেল । কোন গল্পের বই না নিয়ে এবার নিজের অজান্তেই কেন জানি বুক সেলফে পড়ে থাকা সেই ডায়েরিটা ব্যাগে ভরে ফেললাম । এবং ট্রেনে উঠে এক দেড় ঘণ্টা পরেই সেটা পড়তে শুরু করলাম । ডায়েরিতে যা লেখা ছিল তা হুবহু তুলে দিচ্ছি ।
২৩/০৮/২০১০
আমার নেই কোন গাড়ি ।
তোমায় নিয়ে ঘুরব,
সে রিকশা ভাড়াটাও নেই আমার ।
থাকার মধ্যে আছে গালে জমে থাকা
খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি ।
আর আছে সন্দেহের দৃষ্টিতে
একটু বাড়াবাড়ি ।
কবিতা আমি লিখতে জানি না । কবিতা লিখবে কবিরা আমি তো কবি নই । তবুও কেন লিখলাম ? কেন জানি কবিতা লিখতে ইচ্ছে হল । হ্যা মাঝে মাঝে আমার এমন ইচ্ছে হয় । তারপর কিছুদিন সেই ইচ্ছেগুলো মাথায় নিয়ে আমি ঘুরে বেড়াই । সেই ইচ্ছে গুলো আবার কিছুদিন পর নিজ থেকেই মারা যায় । জন্ম হয় নতুন কোন ইচ্ছের । ছেড়া কাথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখার একটা ব্যাপার আমার মধ্যে আছে । ছোট বেলা থেকেই আমি স্বপ্ন দেখতাম তবে কাঁথাটা ছেড়া ছিল কিনা সেটা মনে নেই তবে স্বপ্নগুলো লাখ টাকার ছিল না । স্বপ্নগুলো ছিল খুব গুছানো । আমার ছোট মস্তিস্ক কিভাবে এত সুন্দর করে গুছিয়ে স্বপ্ন বুনত তা ভাবতে এখনো আমার অবাক লাগে । যাই হোক কবিতাটার বাকি কিছুলাইন মাথায় ঘুরছে । লাইনগুলো লিখে নেই ।
আমার নেই ফাইভ স্টার কিংবা কোন রঙ্গমঞ্চে
উঠে দাঁড়াবার ক্ষমতা ।
তবে আমি স্বপ্ন দেখতে জানি ।
লাল, নীল হরেক রঙের স্বপ্ন ,
এই স্বপ্নগুলো নিয়েই আমার যত হয়রানি ।
আমার নেই আকাশ ছোঁওয়া মোটা অঙ্কের টাকা ।
আমার আছে শুধু একগাদা হতাশা আর একটি
ছেড়া পকেট যা সময়ে অসময়ে থাকে পুরোপুরি ফাঁকা ।
হা হা হা এটা তো কবিতা না । এটা আমার মনের কথাগুলোই শুধু কলমে কাগজে বন্দি করলাম …
আমি ডায়েরি পড়া বন্ধ করলাম । নিতান্তই অগোছালো কিছু লেখা । আহামরি তেমন কিছু না বরং একটা সাধারণ মানুষের ছোট ছোট স্বপ্নগুলোই ঠাই করে নিয়েছে ডায়েরির পাতায় । ডায়েরির অন্য পাতাগুলোও হয় তো এমন সাধারণ কিছু কথা দিয়েই সাজানো হবে । তেমন কোন আগ্রহ বোধ করছি না পড়তে তবুও কিছু করার নেই দেখেই ডায়েরির অন্য পাতাগুলো দেখতে লাগলাম । আর তখনি ডায়েরির মাঝের কোন এক পাতা থেকে বের হয়ে এল খুব ছোট করে ভাজ করা একটা চিঠি । ডায়েরিটা রেখে চিঠিটা পড়তে শুরু করলাম । সেখানে লেখা-
ফারিয়া,
আর মাত্র কিছুক্ষণ, তারপর আমি তোমাদের সবাইকে মুক্তি দিয়ে চলে যাব । কেন জানি শেষ মুহূর্তে এসে খুব কষ্ট লাগছে । কিন্তু আজ আমাকে যেভাবেই হোক এই কাজটা করতেই হবে । ফাসির দড়ি, চেয়ার সবকিছু সাজিয়ে এখন আমি টেবিলে বসে লিখছি । আমি জানি এই চিঠি কখনোই তোমার পড়া হবে না । আমি অবশ্য চাইও না যে তুমি আমার এই চিঠিটা পড় । তোমার যখন অন্য কোন ছেলের সাথে বিয়ে হবে তখন তুমি বাসর রাতে আমার এই চিঠি পড়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদবে তা আমি কখনোই চাই না । আচ্ছা ফারিয়া সত্যি কি তুমি কাঁদবে ? কেন জানি মনে হয় তুমি কাঁদবে না । আমার মতো সস্তা কারো জন্য কেঁদে নষ্ট করবার মতো সময় নিশ্চয়ই তোমার নেই । আচ্ছা ফারিয়া তোমার কি মনে আছে তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলে ভালোবাসার মানে কি ? আমি হেসে উত্তর দিয়েছিলাম তোমার পারফিউমের গন্ধ । আমার কাছে আসলেই কিন্তু তাই । তোমার পারফিউমে কি জানি কি ছিল যা আমাকে পাগল করে দিল । তারপর থেকে তোমার নামই হয়ে গেল মিস পারফিউম । জানো ফারিয়া, আজ সুইসাইড করতে আমার অদ্ভুত কষ্ট হচ্ছে । তবে আমি জানি সুইসাইড করে ফেললেই আমার সব কষ্ট শেষ । কারন আমার মৃত্যুর পর নিশ্চয়ই আমার আত্মা তোমাকে কল করবে না এবং দেখবে না তুমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওয়েটিং থাক । তুমি ওয়েটিং থাক সেটা নিয়ে আমার কোন মাথা ব্যাথা ছিল না । তোমার যে আমার মতো আরও দুজন প্রেমিক আছে তা তুমি আমাকে জানালে না কেন বল তো ? জানালে আমি কি আর তোমাকে নিয়ে এত এত স্বপ্ন বুনতাম আমার মনের মধ্যে । মনে আছে ফারিয়া একদিন তুমি আর আমি দুজন মিলে আইসক্রিম খাচ্ছিলাম এমন সময় তুমি আমাকে বললে যে বিয়ের পর আমি আর নিজ হাতে ভাত খেতে পারব না । আমি ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম কেন ? আর তুমি উত্তর দিলে বিয়ের পর তোমার হাতে প্রতিদিন আমাকে ভাত খেতে হবে । সেদিন আমি কি যে খুশী হয়েছিলাম তা হয়তো কখনোই আমি বলে বুঝাতে পারব না । সেদিন বাসায় এসে আমি স্বপ্নও দেখে ফেললাম যে তোমার আর বিয়ে হয়েছে আমরা কি সুখেই না সংসার করছি । কে জানত আমার এই স্বপ্ন যে আজীবন স্বপ্নই থাকবে । এতদিনের মধ্যে আজই কেন সুইসাইড করছি সেটা তোমাকে বলি । আজ আমার মা বাসায় নেই । আর বাবা তো সেই কবেই মরে ভূত হয়ে গেছেন । আচ্ছা বাবা কি আমায় দেখতে পাচ্ছেন ? তিনি নিশ্চয়ই তার ছেলের এরকম উদ্ভট কাজকর্ম দেখে কপাল কুচকে রেখেছেন । হয় তো বকাঝকাও দিচ্ছেন কিন্তু আমি তা শুনতে পাচ্ছি না । সমস্যা নেই বাবা আমি আসছি । তোমার বকা ঝকা শুনতে চিরদিনের জন্যই আসছি । মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে । তিনি যখন বাসায় আসবেন তখন হয় তো আমি আর জীবিত থাকব না । নিজের একমাত্র ছেলেকে ফ্যানের সাথে ঝুলে থাকতে দেখে মা কি করবেন আল্লাহ্ মালুম । নিশ্চয়ই অনেক কাঁদবেন । আমার ছোট কিছু হলেই মা কেঁদে টেদে অস্থির হয়ে যান , ছোটবেলায় কি হয়েছিল জানো ফারিয়া ? একদিন হটাত করেই খেলতে গিয়ে আমার মাথা ফেটে গেল । আমার মাথায় রক্ত দেখে মা যে কি পরিমাণ পাগলের মতো কেঁদেছিল তা এখনো আমার চোখে ভাসে । আর আমি দুনিয়া থেকে বিদায় নিচ্ছি তিনি কাঁদবেন না এমনটা কি হয় ? তবুও আমাকে যেতে হচ্ছে । কারন আমি চোখে এখন অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাচ্ছি না । আচ্ছা ফারিয়া তোমার হাতে যদি কখনো এই চিঠি পৌছায় কিংবা কোনভাবে তুমি জানতে পারো আমি মারা গেছি তাহলে কি তুমি আমার কবরটা দেখতে যাবে ? আমার মনে হয় না তুমি যাবে । এত সময় সত্যি কি আছে তোমার ?
শেষ যখন আমি তোমার সাথে দেখা করবার জন্য বসুন্ধরা সিটিতে টানা আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষা করলাম তখনো কিন্তু তুমি আসোনি । ফারিয়া তোমাকে অনেক অনেক কথা লেখার ছিল । কেন জানি শেষমুহূর্তে এসে কোন কিছুই গুছিয়ে লিখতে পারছি না । বার বার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে । পুরুষ মানুষের চোখে বার বার পানি আসাটা খুবই লজ্জার । তবুও কেন যে এই লজ্জার মধ্যে দিয়ে আমার বার বার যেতে হয়েছে তা শুধু আমিই জানি । আমার খুব কষ্ট হচ্ছে । অনেক বেশী কষ্ট হচ্ছে । তবুও আমি নিরুপায় । অনেক অনেক ভালো থেকো ফারিয়া । আর কখনোই তোমাকে এসে বলা হবে না মিস পারফিউম ভালোবাসি , বড্ড বেশী ভালোবাসি তোমায় ।
ইতি
দুঃস্বপ্নের রাজপুত্র…
চিঠিটা পড়ে শেষ করলাম । শেষ করা মাত্রই চিঠিটি ডায়েরিতে যেভাবে ভাজ করা ছিল সেভাবে ভাজ করে রেখে দিলাম । চিঠির ঠিক কোথায় যেন কি একটা ছিল যা একদম বুকে আঘাত করল । হটাত করেই খেয়াল করলাম আমার চোখেও পানি । সাথে সাথে রুমাল দিয়ে চোখের পানি আড়াল করবার চেষ্টা করলাম । ভুলে গেলে তো হবে না আমরা পুরুষ মানুষ । আমাদের তো কাঁদতে নেই । আর এইসব ফালতু চিঠি নিয়ে গল্প লেখার তো প্রশ্নই উঠে না …



