সিসি ডেস্ক: প্রেসক্রিপশনে লেখা বাম চোখ কিন্তু পাঁচ বছরের সোহানার অপারেশন হয়েছে ডান চোখে! জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ সোহানার পরিবারের।
ভুল চিকিৎসার এ খবরে মঙ্গলবার জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়- হাসপাতালের পাঁচতলার ওয়ার্ডে সোহানার বেডের পাশে স্বজন ও অন্য রোগীর স্বজনদের ভিড়, ক্ষুব্দ সবাই। অথচ এ ঘটনার পর কোনও চিকিৎসক বা নার্স একবারও সোহানার পরিবারের সঙ্গে কথা বলেননি। অপারেশনের পর ডান চোখে ব্যান্ডেজ দেখে সোহানার কৃষকবাবা চিকিৎসকদের এ ভুল অপারেশনের কথা জানালে তারা বলেন- ২১ দিন পর আবার এসে হাসপাতালে ভর্তি হলে বাম চোখের অপারেশন করে দেবেন।
সোহানার মা রোকেয়া বেগম এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমরা মূর্খ দেইখ্যা কি ডাক্তাররাও মূর্খ? ডাক্তাররা কেমনে এই ভুল করলো? আমার মাইয়ার জীবনটা কেমনে শেষ কইরা দিলো তারা।’
সোহানার মা জানান, ২১ দিন আগে খেলতে গিয়ে আরেক শিশুর ইটের আঘাতে বাম চোখের দৃষ্টি হারায় সোহানা। প্রাথমিকভাবে দুই দফা বি-বাড়িয়া হাসপাতালে গেলে তারা এই হাসপাতালে আসার জন্য বলেন। গত বৃহস্পতিবার সোহানাকে এ হাসপাতালে ভর্তি করি। আজ সকাল ১১টায় মেয়ের অপারেশন হয়। কিন্তু অপারেশন শেষ হবার পর মেয়েকে নিয়ে বেডে এলে দেখি- ডান চোখে ব্যান্ডেজ লাগানো! বিষয়টি মেয়ের বাবাকে জানালে তিনি মেয়েকে তিন তলায় অবস্থিত অপারেশন থিয়েটারের চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। বিষয়টি জানানোর পর চিকিৎসক মেয়েটির ডান চোখের ব্যান্ডেজ খুলে দেন।
সোহানার মা বলেন, ‘কোন চোখের অপারেশন হইছে এটা যেন বুঝা না যায় সেইজন্যই ডাক্তর ব্যান্ডেজটা খুলছে, এহন আমার মাইয়্যা ডান চোখেও কিছুই দেখে না’ বলেই কাঁদতে থাকেন রোকেয়া। ‘গেরামের মাইনষ্যের কাছে চাইয়া টাকা নিছি। কেউ ১০০০, কেউ ৫০০, কেউ দশ-বিশ কইরা টাকা দিছে, হেই টাকা লইয়্যা আমি চিকিৎসা করাইতে আইছি। কাইল যে আমি যামু গা, সেই টাকাও আমার কাছে নাই, আবার ২১ দিন পর আমি কেমনে আমু? টাকা পামু কই?’
সোহানার বাবা রয়িজ মিঞা বলেন, অপারেশনের এক ঘণ্টা পর তিনতলায় ডাক্তারের কাছে গিয়া বলি, মাইয়ার ব্যথা বাম চোখে, আপনারা ডান চোখে অপারেশন করছেন, এ কথা বলতেই ডাক্তার আমারে বলেন- মেয়েকে তাড়াতাড়ি তার কাছে নিয়ে যেতে। তারপর তিনি ডান চোখের ব্যান্ডেজ খুলে দেন। এরপর ভর্তির সময় প্রথম যেই ডাক্তার ছিল তার কাছে যাই। সেই আপা আমারে বলেন, ‘তুমি যাও আমি আসতেছি। তারপর কতো ঘণ্টা পার হইল সে আর আসে নাই, কেউ আসে নাই, খবরও নেয় নাই। আমার মাইয়ারে অন্ধ কইরা তারা কেউ একটু দেখতেও আইলো না।’
এ ঘটনায় হাসপাতালটির পাঁচতলার প্রতিটি ওয়ার্ডেই চলছে কানাঘুষা। রোগীসহ আত্মীয়-স্বজনরা ক্ষোভে ফুঁসছেন। এ প্রতিবেদক সেখানে উপস্থিত থাকাকালেই অনেকেই এসে হাসপাতালের এ কাণ্ডে চরম বিস্ময় প্রকাশ করছেন, কেউ হয়েছেন ক্ষুব্ধ।
বাবাকে নিয়ে আসা আল আমীন বলেন, এতোদিন সরকারি হাসপাতালে হয়রানির কথা শুনছি, এখন দেখছি ভুল চিকিৎসাও হয়। আমাদের মতো দরিদ্র মানুষ তাহলে যাবে কোথায়? আমরা তো আর ল্যাবএইড, স্কয়ারে, অ্যাপোলোতে যেতে পারব না। তাহলে কি খারাপ হওয়া চোখ ভালো হওয়ার আশা নিয়ে এখানে এসে ভালো চোখটাও হারাতে হবে?
আরেক রোগীর স্বজন বলেন, ভুল হতে পারে তাই বলে এতবড় ভুল? ডাক্তারদের এতো বড় ভুল হলে মানুষের কী হবে, প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি বলেন, অপারেশন ভুল করছে, তারপর যে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব থাকে সেটাও তো তারা করেননি। তারা ভুল স্বীকার করে এই মেয়েকে ক্ষতিপূরণ দিক, যদিও তখন পাশ থেকে সোহানার মা বলে ওঠেন- ‘আমার মেয়ের ভালো চোখ নষ্ট করার ক্ষতিপূরণ তারা কী দিব?’
একই ওয়ার্ডের এক রোগীর স্বজন বলেন, হাসপাতালের একজন কর্মকর্তা কিছুক্ষণ আগে এসেছিলেন ওয়ার্ড রাউন্ড দিতে, তখন বললাম, ভাই আপনারা এটা কী করলেন? উনি উল্টো ঝাড়ি দিয়ে বললেন, সমস্যা কী, কয়েকদিন পর আবার বাম চোখের অপারেশন করে দেবে।
মঙ্গলবার দুপুর তিনটা থেকে বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত চক্ষু ইন্সটিটিউটের পাঁচতলার সোহানার ওয়ার্ড, তিন তলার অপারেশন থিয়েটার এবং চারতলায় ঘুরেও এ বিষয়ে কথা বলার জন্য কোনও চিকিৎসককে পাওয়া যায়নি। পাঁচতলার নার্সেস রুমে গিয়ে অনেকবার জিজ্ঞেস করেও সোহানার অপারেশন করা চিকিৎসকের নাম জানা যায়নি।
এ বিষয়ে জাতীয় চক্ষু ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের সহকারী রেজিস্ট্রার মো. আতিকুল হক বলেন, আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারব না। কোন কোন ডাক্তার আজ অপারেশন করেছেন সেটাও বলতে পারছি না। আগামীকাল বুধবার অফিস চলাকালীন সময়ে হাসপাতালে আসার পরামর্শ দেন তিনি।