সিসি ডেস্ক: পৌরসভা নির্বাচন নিয়ে জটিলতা কাটছে না। এর আগে নির্দলীয় থাকলেও এবার দলীয়ভিত্তিতে গিয়ে তফসিল ঘোষণার আগে দুই দফা জটিলতায় পড়ে সরকার ও কমিশন। তফসিল ঘোষণার পর দুই দিনের মাথায় নির্বাচনী প্রচারণায় সংসদ সদস্যদের অংশ না নেওয়াকে কেন্দ্র করে নতুন জটিলতা দেখা দিয়েছে।
সংসদ সদস্যদের প্রচারণায় অংশ না নেওয়ার বিধান রেখে পৌরসভা নির্বাচনের আচরণবিধি তৈরি করে সেই আলোকে গত মঙ্গলবার (২৪ নভেম্বর) তফসিল ঘোষণা হয়। কিন্তু এখন সরকারি দল থেকে দাবি উঠছে এ বিধিনিষেধ তুলে দেওয়ার। আগামী রবিবার সরকারি দলের পক্ষ থেকে এ দাবি জানিয়ে আনুষ্ঠানিক চিঠিও দেওয়া হবে বলে দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে তফসিল ঘোষণার পর আচরণবিধিতে পরিবর্তন আনার সুযোগ রয়েছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। খোদ নির্বাচন কমিশন বিষয়টি নিয়ে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার (অব) এম. শাখাওয়াত হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কমিশন ও সরকার দুই পক্ষই সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা না করে তাড়াহুড়া করে এটা করতে গিয়ে এসব জটিলতা সৃষ্টি করেছে।
পৌরসভাসহ স্থানীয় সরকারের পাঁচটি স্তরের সবগুলোতেই দীর্ঘদিন ধরে নির্দলীয়ভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। সেই আলোকে মেয়াদপূর্ণ হওয়া পৌরসভার নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশন গত জুলাই থেকে আনুষ্ঠানিকতা শুরু করে। এরইমধ্যে নির্বাচন দলীয়ভাবে করার সিদ্ধান্তে কমিশনের কার্যক্রমে কিছুটা ভাটা পড়ে। সিদ্ধান্ত অনুসারে সরকার স্থানীয় সরকারের সব স্তরে দলীয় মনোনয়নে নির্বাচন অনুষ্ঠানে মন্ত্রিসভায় আইনগুলোর অনুমোদন দেয়। নির্বাচন কাছাকাছি থাকায় পৌরসভা আইনটি অধ্যাদেশ আকারে জারি করা হয়। যার আলোকে নির্বাচন কমিশন বিধিমালা ও আচরণবিধি তৈরি করে ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয় পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু এরই মধ্যে পৌর পরিষদের মেয়র পদটি দলীয় মনোনয়ন ও অন্য পদ দুটি পূর্বের মত নির্দলীয়ভাবে করতে সরকারের পক্ষ থেকে চিন্তা করা হয়। এতে করে আবারও ঝুলে যায় ইসির তফসিল ঘোষণার কার্যক্রম। পরে অধ্যাদেশ বাতিল করে নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দ্রুততার সঙ্গে সংসদে বিল পাস করা হয়। এর আলোকে কমিশন নতুন করে বিধিমালা ও আচরণবিধি তৈরি করে গত ২৪ নভেম্বর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে।
আচরণবিধিতে প্রধানমন্ত্রী, সংসদের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী, চিফ হুইপ, বিরোধীদলীয় নেতা, সংসদ উপনেতা, বিরোধীদলীয় উপনেতা, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, হুইপ বা তাদের সমমর্যাদার কোনও ব্যক্তি, সিটি করপোরেশনের মেয়র ও সংসদ সদস্যরা নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিতে পারবেন না বলে বিধান রাখা হয়। অবশ্য কমিশন গত ৫ নভেম্বর ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো আচরণবিধিতে সংসদ সদস্যসহ অন্যদের প্রচারণায় অংশ নেওয়ার বিধান রাখলেও বরং সরকারের আপত্তিতেই তা বাদ দেওয়া হয়।
এদিকে তফসিল ঘোষণার দু’দিনের মাথায় সরকারি দল আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে নতুন দাবি উঠেছে। দলটির দাবি সংসদ সদস্যদের এই নির্বাচনে প্রচারে অংশ নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত দলটির সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরাম কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত হয়। সেই আনুযায়ী এ দাবি নিয়ে রবিবার দলের একটি প্রতিনিধি দল নির্বাচন কমিশনে যাচ্ছে। এর আগে নির্বাচনে দলীয় এমপিদের প্রচারণায় অংশ নেওয়ার সুযোগ নিয়ে বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ইসি সচিব মো. সিরাজুল ইসলামসহ ইসি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। কিন্তু এমপিদের এমন দাবির সঙ্গে নীতিগতভাবে একমত হলেও আইনগত জটিলতার আশঙ্কায় কমিশন বিধি সংশোধনে রাজি হয়নি বলে জানা গেছে। ওই বৈঠকে সরকারের নির্বাচন বিষয়ক একাধিক আইনি পরামর্শক উপস্থিত ছিলেন।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ক্ষমতাসীন দলের এমপিরা মনে করছেন, নতুন আচরণবিধিতে প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপির চেয়ারপারসন থেকে শুরু করে সর্বস্তরের নেতারা দলীয় মেয়র প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে নামার সুযোগ পাচ্ছেন। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের সঙ্গে এমপিদেরও বিধি-নিষেধের আওতায় পড়ে প্রচার কাজে বিরত থাকতে হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে তারা সরকারের উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ করেছেন। এরই ভিত্তিতে আইন মন্ত্রণালয় থেকে এমপিদের প্রচারে নামার সুযোগ দিতে ইসিকে প্রস্তাব দেওয়া হয়।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার, নির্বাচন কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা ও আইন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে নির্বাচনী বিধি বা আচরণবিধিতে কোনও ধরনের পরিবর্তন আনলে আইনগতভাবে কোনও জটিলতা দেখা দেবে না। কারণ বিধি কোনও আইন নয়। আর এ পরিবর্তনের কারণে নির্বাচনের চরিত্রগত কোনও পরিবর্তন হবে না। তবে, তফসিল ঘোষণার পর বিধিতে পরিবর্তন নৈতিক দিক থেকে উচিত হবে না বলে মনে করেন কেউ কেউ। অবশ্য তফসিল ঘোষণার পর বিধিমালায় পরিবর্তন আনাকে কোনও কোনও কর্মকর্তা আইনি জটিলতা হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, বিধিমালার আলোকেই নির্বাচনের তফসিল হয়েছে। সেখানে বিধিমালায় সংশোধন বা পরিমার্জন করতে হলে তফসিলেও তার প্রভাব পড়বে।
তফসিল ঘোষণার পর বিধি পরিবর্তন প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক সাংবাদিকদের বলেন, গত মঙ্গলবার পৌর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। এরপর বিধি সংশোধন করতে গেলে আইনি জটিলতা দেখা দিতে পারে।
কমিশনার আবদুল মোবারকের সঙ্গে কমিশনারের সাথে দ্বিমত পোষণ করেন নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিব সিরাজুল ইসলাম। ইসি সচিব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কেউ যদি কমিশনে এসে কোনও দাবি তোলে তাহলে সেটা সম্ভব কি না কমিশন তা বিবেচনা করবে। এ বিষয়ে কমিশনার আবদুল মোবারকের মন্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে ইসি সচিব বলেন, ‘পত্রিকায় দেখলাম মোবারক সাহেব বলেছেন কোনও সুযোগ নেই। এটা উনার ব্যক্তিগত বক্তব্য। কিন্তু সিদ্ধান্তগুলো কমিশনের হবে। কমিশন যদি মনে কবে তাহলে এই সুযোগ তারা দিতে পারবে এবং দেবে। না চাইলে হবে না। তবে, এ বিষয়ে আইনের দৃষ্টিভঙ্গি কি তা আমার জানা নেই।’
সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম. সাখাওয়াত হোসেনের মতে আচরণবিধিতে পরিবর্তন না হলে নতুন করে তফসিলের প্রয়োজন পড়বে না। এটা তো আইন নয় যে পরিবর্তন করা যাবে না। আর এতে করে তো নির্বাচনের চরিত্রগত কোনও পরিবর্তন আসছে না। তবে, তফসিল হওয়ার পর করতে গেলে বিষয়টা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। সরকারবিরোধীরা অভিযোগ করতে পারে বিশেষ সুবিধা নেওয়ার জন্য সরকারি দল এখন এটা চাচ্ছে।
তিনি বলেন, সমস্যা হচ্ছে এই নির্বাচন নিয়ে যা কিছুই করা হয়েছে তা কোনও আলোচনা করে করা হয়নি। তড়িঘড়ি করেই এসব করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলসহ সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে করা হলে এসব প্রশ্ন নতুন করে উঠত না। আলোচনা না করার কারণে এখন আমরা পদে পদে জটিলতা দেখতে পাচ্ছি। তবে এমপিরা যেহেতু রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন না, তাই তাদের জন্য এই সুযোগ থাকা উচিত।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের উপকমিটির সহ-সম্পাদক অ্যাডভোকেট রিয়াজুল কবীর কাওসার বলেন, দলীয় এমপিরা যাতে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে পারেন সে দাবি জানাতে আমরা রবিবার কমিশনে যাবে। আশা করি ইতিবাচক ফল পাবো। কমিশন চাইলে এখনও এই বিধান কার্যকর করতে পারে বলে মনে করেন এই আইনজ্ঞ।
উল্লেখ্য, দেশের ২৩৪টি পৌরসভার নির্বাচনের জন্য ইসি গত ২৪ নভেম্বর তফসিল ঘোষণা করেছে। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ৩ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করা হবে ৫ ও ৬ ডিসেম্বর এবং মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ১৩ ডিসেম্বর। ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে আগামী ৩০ ডিসেম্বর।