সিসি ডেস্ক: ভাড়াটিয়া সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য সংশ্লিষ্ট থানায় না দিলে দণ্ডবিধি অনুযায়ী শাস্তি পেতে হবে বাড়ির মালিকদের। আগামী ১৫ মার্চের মধ্যে তাদের ভাড়াটিয়া ও বাড়ির কর্মচারীর তথ্যসংবলিত নির্ধারিত ফরম নিকটবর্তী থানায় জমা দিতে হবে। তথ্যসংবলিত ফরম সংগ্রহে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট থানার কর্মকর্তাকেও জবাবদিহি করতে হবে। এ ছাড়া বাড়ি ভাড়া দেওয়ার আগেই জাতীয় পরিচয়পত্রের অনুলিপি বাধ্যতামূলকভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। ঢাকায় বসবাসরত নাগরিকদের সম্পর্কে তথ্য জানতে বুধবার ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সদর দপ্তর থেকে রাজধানীর ৪৯ থানায় এ সংক্রান্ত কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর আগে গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজধানীর বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়াদের সম্পর্কে সব ধরনের তথ্য সংগ্রহের জন্য ডিএমপি কমিশনারদের নির্দেশ দেন।
অবশ্য আগে থেকেই বাড়ির মালিকদের কাছ থেকে ভাড়াটিয়ার তথ্য সংগ্রহ করার এ নিয়ম আছে। কিন্তু প্রায় এলাকায়ই তা মানা হয় না। কোনো কোনো এলাকায় তথ্য সংগ্রহ করা হতো অনিয়মিতভাবে। বাড়ির মালিকদের কাছে তথ্য চেয়ে ফরম সরবরাহ করা হলেও সেগুলো ফের সংগ্রহে পুলিশের ছিল ব্যাপক অনাগ্রহ। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর নড়েচড়ে বসেছে ডিএমপি। থানাগুলোকে তথ্য সংগ্রহে দেওয়া হচ্ছে কঠোর নির্দেশনা। এখন থেকে প্রতি মাসেই এ সম্পর্কে আপডেট থাকতে হবে থানাগুলোকে। ডিএমপি সূত্র জানায়, ভাড়াটিয়া ও
বাড়ির কর্মচারী সম্পর্কে তথ্য চাওয়ার বিষয়ে শিগগিরই গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সংবাদ সম্মেলন করবেন তারা। সেখানে এর ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরা হবে। এ বিষয়ে জনগণের সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করা হবে।
আইনগত ভিত্তি : ফৌজদারি কার্যবিধির ৪২ ধারায় বলা হয়েছে, সরকারি কাজের স্বার্থে বা তদন্তের স্বার্থে জনগণকে সহায়তা করতে হবে পুলিশকে তথ্য দিয়ে। এ ধারা অনুযায়ী পুলিশ যে-কারও কাছে তার কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট তথ্য চাইতে পারে। পাশাপাশি জনগণকেও পুলিশকে এ বিষয়ে সহায়তা করতে হবে। কেউ তথ্য দিতে অসহযোগিতা করলে বা আপত্তি জানালে পুলিশ তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারবে।
এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক শ ম রেজাউল করিম বলেন, ‘আইন অনুযায়ী কোনো পুলিশ কর্মকর্তা তথ্য চাইলে জনগণকে তা সরবরাহ করতে হবে। কেউ তা না করলে তাকে পুলিশ দণ্ডবিধি অনুযায়ী শাস্তি দিতে পারে।’
ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘ভাড়াটিয়াদের তথ্য নেওয়ার বিষয়টি অনেক আগে থেকেই চলে আসছে। এবার তা আরও জোরালো করা হচ্ছে। নগরবাসীর নিরাপত্তার জন্যই এটা করা হচ্ছে।’
কমিশনার বলেন, ‘বাড়ির মালিকরা নিজেদের অজান্তেই সন্ত্রাসী ও জঙ্গি সদস্যদের বাসা ভাড়া দিয়ে থাকেন। কিন্তু সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে পালিয়ে যায়। মালিকদের নিরাপত্তার স্বার্থেই ভাড়াটিয়াদের বিস্তারিত তথ্য রাখা প্রয়োজন। তবে নির্ধারিত ফরমে অনেক সময় ভুল তথ্য দেওয়া হয়। এজন্য এবার জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি রাখার বিষয়ে বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হচ্ছে।’
১৭ ধরনের তথ্য জানাতে হবে : ২০০৮ ও ২০০৯ সালে রাজধানীর মিরপুর ও কদমতলী এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকার কয়েকটি বাসা থেকে জেএমবি জঙ্গিদের গ্রেফতার করে পুলিশ। ওই সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরে আসে জঙ্গিরা পরিচয় গোপন করে বাড়ি ভাড়া নিয়ে কার্যক্রম চালাচ্ছে। পরে ভাড়াটিয়ার তথ্য সংগ্রহে পুলিশের পক্ষ থেকে বিশেষ ফরম সরবরাহ করা হয়। ওই ফরমে ভাড়াটিয়া ও বাড়িওয়ালার নাম, বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা, জন্মতারিখ, পেশা, জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর, মোবাইল ফোন নম্বর, ছবি ও আঙুলের ছাপ, পরিবার বা মেসের সদস্যসংখ্যা, গৃহকর্মী ও গাড়ি চালকের নাম (যদি থাকে), পূর্ববর্তী বাড়ির মালিকের নাম, বাসা ছাড়ার কারণসহ ১৭ ধরনের তথ্য চাওয়া হয়। এ ছাড়া ভাড়াটিয়া ব্যক্তিকে চেনে-জানে এমন দু’জন শনাক্তকারীর ও তার আগের ভাড়া বাড়ির মালিকের ফোন নম্বরসহ নাম-ঠিকানা যুক্ত করার বিধান জুড়ে দেওয়া হয়।
তথ্য সংগ্রহে মন্থরতা : নির্ধারিত ফরমভুক্ত ১৭টি তথ্যের ভিত্তিতে ভাড়াটিয়া ব্যক্তি কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত কি- না, পুলিশের তা যাচাই করার কথা। বেশ কিছুদিন এমন তথ্য সংগ্রহ অভিযান চললেও পরে তা স্থবির হয়ে পড়ে। ঢাকা মহানগর পুলিশের অপরাধ বিভাগের কয়েক কর্মকর্তা জানান, নানা ব্যস্ততার কারণে ভাড়াটিয়াদের তথ্য সংগ্রহে শতভাগ মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে রাজধানীর উত্তরা, গুলশান, বনানী ও ধানমণ্ডির মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় প্রায় সব বাড়ির ভাড়াটিয়াদের তথ্য রয়েছে পুলিশের কাছে। অবশ্য এসব তথ্য আর হালনাগাদ করা হয়নি। আবার নতুন ভাড়াটে উঠলেও বাড়ির মালিকরা নিজে থেকে তা আর থানায় সরবরাহ করেননি। ফলে বাড়ির ভাড়াটিয়া সম্পর্কিত তথ্যভাণ্ডার গড়ে ওঠেনি।
সর্বশেষ গত কয়েক বছরে ঢাকায় রাজনৈতিক সহিংসতার পর সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করতে ভাড়াটিয়াদের বিষয়ে নতুন করে তথ্য নেওয়া শুরু হয়। তবে সহিংসতা মোকাবেলায় পুলিশ ব্যস্ত রয়েছে- এ অজুহাতে সে কার্যক্রমও এগোয়নি। ২০১৫ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বরে ডিএমপি সদর দপ্তর থেকে ঢাকার বাড়িওয়ালাদের কাছে অন্তত ১০ লাখ ফরম পাঠানো হয়। এর পর গত কয়েক মাসে থানাগুলোতে জমা পড়েছে মাত্র আড়াই লাখ ফরম। বাকি ফরম পূরণ করে জমা নেওয়ার বিষয়ে থানা পুলিশের তৎপরতাও নেই। এ পরিস্থিতিতে কঠোর হতে চলেছেন ডিএমপি কমিশনার।
‘মালিকরা অসহযোগিতা করছেন’ : ঢাকার কয়েকটি থানার ওসি জানান, ভাড়াটিয়াদের তথ্য চাইতে গেলে বাড়ির মালিকরা নানাভাবে অসহযোগিতা করেন। কারণ তাদের ধারণা, এর ফলে বাড়ি ভাড়া সম্পর্কিত তথ্য ফাঁস হয়ে যাবে। তাই বাসায় বাসায় ফরম পৌছে দিয়ে বারবার তাগাদা দিলেও পূরণ করা ফরম আর ফেরত আসে না। যেসব ফরম ফেরত আসে, তাতে সব ধরনের তথ্যও থাকে না। অনেক সময় এক ফ্ল্যাটে একাধিক ব্যক্তি বসবাস করলেও ফরমে সে তথ্য গোপন রাখা হয়।
ঢাকা মহানগর ডিবি পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, গত শুক্রবার রাতে বাড্ডার সাঁতারকুলের জিএম বাড়ি এলাকার ৭ নম্বর রোডের ৫৭৭ নম্বর বাড়ি থেকে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের দুই জঙ্গিকে গ্রেফতার করা হয়। গোয়েন্দারা তদন্ত করে দেখেন, বাড়ির মালিক তাদের কাছে বাসা ভাড়া দেওয়ার সময় কোনো তথ্যই রাখেননি। দুই জঙ্গিকে জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে পরের দিন মোহাম্মদপুরের নবোদয় হাউজিংয়ের একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাদের বোমা তৈরির কারখানার সন্ধান পায় ডিবি পুলিশ। অভিযানের আগেই বোমা কারিগররা পালিয়ে যায়। তাদের বিষয়েও কোনো তথ্য ছিল না ওই বাড়ির মালিকের কাছে।
এর আগে ২৪ ডিসেম্বর মিরপুরের শাহআলী এলাকার একটি বাসার জঙ্গি আস্তানা থেকে ডিবি পুলিশ শক্তিশালী গ্রেনেড ও বিপুল বিস্ফোরকসহ সাত জঙ্গিকে গ্রেফতার করে। সেখানে ওই সাতজন নিজেদের ছাত্র পরিচয় দিয়ে ভাড়া থাকত। তাদের প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কেও বাড়ির মালিকের কাছে কোনো তথ্য ছিল না। এর আগে গত অক্টোবরে গাবতলী চেকপোস্টে এএসআই ইব্রাহিম মোল্লা ছুরিকাঘাতে খুনের ঘটনায় কামরাঙ্গীরচর এলাকার একটি মেস থেকে বোমা ও হাতে তৈরি গ্রেনেড উদ্ধার করা হয়। কয়েকজনকে আটক করা হয়, যাদের পরিচয়ই জানতেন না বাড়ির মালিক।