।। খুরশিদ জামান কাকন ।।
সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে বাসযোগে ডিমলা উপজেলার বন্যা কবলিত এলাকা পরিদর্শন ও ত্রান বিতরন করার উদ্দ্যেশে আমরা সৈয়দপুর প্রথম আলো বন্ধুসভার বন্ধুরা গত ১৩ আগষ্ট রোজ শনিবার সকাল ৯ ঘটিকায় বাসযোগে রওনা দেই। ঘন্টা দেরেক বাদে আমরা পৌছালাম নীলফামারীর তিস্তা ব্যারেজে। বাসপথে যাত্রার পরিসমাপ্তি ঘটলো ওখানেই। বাকীপথ ত্রাণ নিয়ে ট্রাক্টরে কোনরকমে ঠেলেঠুলে চেপে বসে আমাদের ২৮ সদস্যের প্রতিনিধি দলের যাত্রার জন্য অপেক্ষা। তারই ফাকে আমরা সেরে নিলাম দুপুরের খাবার। পর্যাপ্ত পানির সংকটে পড়ে আমরা পড়েছিলাম বিপাকে। দুই কিলোমিটার রাস্তা পারি দিয়ে দূরব্যবস্থা থেকে রক্ষা পেতে আনা হলো বিশুদ্ধ খাবার পানি। পানি পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে অতঃপর আমরা প্রথমবারের মতো ট্রাক্টরের যাত্রী। আমাদের অনভিজ্ঞ যাত্রী নিয়ে চালক রওনা দিলো গন্তব্যের পথে। কিন্তু ওমা একি রাস্তা না খালের উপর দিয়ে যাচ্ছি আমরা। উঁচুনিচু মাটির ভাঙ্গা রাস্তায় ট্রাক্টর একবার এদিকে দুলে তো আরেকবার ওদিকে দুলে। আমরা আতঙ্কিত হলেও ভালো কাজ করার দৃঢ় প্রত্যয় থাকায় কিঞ্চিত পিছুপা হইনি।
.
আরো ঘন্টাখানিক বাদে আমরা পৌছালাম এক নদীর ঘাটে। ভেবেছিলাম এখানেই বুঝি আমাদের ত্রানবিতরন কার্যক্রম চলবে। কিন্তু না আমাদের নৌকায় আরো পারি দেয়া লাগবে আরো ৩ কিলোমিটার পথ। আমাদেরকে আমন্ত্রণ জানাতে সেখানকার জনপ্রতিনিধির পাশাপাশি সহযোগীতা করতে সেখানকার ২০-২৫ জন স্থানীয় বাসিন্দা স্বেচ্ছায় ছুটে এসেছেন।
.
আমাদের জন্য বরাদ্দ তিনটি নৌকা। একটিতে ত্রাণ অন্যদুটিতে আমরা। কিন্তু নৌকায় চড়ে এ কোন অবস্তায় আমরা। নৌকা একবার এদিকে হেলে তো আরেকবার ওদিকে হেলে। আমরা ভয় পেয়ে আরো বেশি নড়াচড়া করি। মাঝি আমাদের কাণ্ডকারখানা দেখে হাসে এবং সবাইকে নিজ নিজ অবস্থানে বসতে বলে। নৌকা ছাড়লো ভেবছিলাম আমরা নদী করে যাচ্ছি। কিন্তু না খানিক পথ যেয়েই দেখা মেলে বন্যা কবলিত এলাকার ক্ষয়ক্ষতির লীলাখেলা। গত ২৭ দিন ধরে নীলফামারীর ডোমার উপজেলার চড় খড়িবাড়ী ইউনিয়নের এ এলাকা বন্যা কবলিত। গত ৭ দিন হলো পানি কমতে শুরু করেছে। বাড়িঘর থেকে পানি নেমে আসলেও চারপাশের আবাদি জমি, রাস্তা, পুল, সাকো সব বানের জ্বলে ডুবে আছে। বিচ্ছিন্ন সেখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থা। নৌকা ছাড়া সেখানে লোকজনের চলাফেরার কোন গতি নেই। তারপরও অনেকে কলাগাছের ভেলা দিয়ে প্রয়োজনের তাগিদে জীবনের ঝুকি নিয়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থান যায়। সামনে আরো এগিয়ে গেলে দেখা মিলে রাস্তা বিহীন সেতুর। অর্থাৎ বন্যায় দুপারের রাস্তা এখনো পানির তলে। সেখানে চোখে পড়ে বিচ্ছিন্ন বিচ্ছিন্ন ভাবে গড়ে উঠা বশতির লোকজনের পানিবন্দি থাকার করুন পরিণতি।
.
তখন বেলা ৩ টা ৩০ আমরা ত্রাণ নিয়ে পৌছালাম কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। সেখানকার অধিবাসী ৮০০ হলেও আমরা ত্রাণ দিতে পেরেছি মাত্র ২০০ জনকে। ত্রাণ দেয়ার আনুষ্ঠানিকতায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ছাড়াও বক্তব্য রাখেন প্রিয় ব্যক্তিত্ব প্রথম আলোর সৈয়দপুর প্রতিনিধি এম.আর.আলম ঝন্টু ভাই, সৈয়দপুর বন্ধুসভার উপদেষ্টা নাসিম রেজা স্যার এবং সভাপতি আসাদ ভাই। ত্রাণ বিতরণ পর্ব চলছে এমনি সময় হঠাৎ ৮০ বছরের বৃদ্ধা এক দাদীমা সবার সামনে অশ্রুসিক্ত চোখে কিছু বলার জন্য এগিয়ে আসেন। আমরাও তার কথা শুনার জন্য অধির আগ্রহ প্রকাশ করি। তিনি জানান গত দুই দিন আগে তার একমাত্র বেচে থাকার সম্বল হিসেবে আদরের যুবক নাতী বজ্রপাতে মারা গেছে। সবমিলিয়ে আর্থিক -শারীরিক – মানুষিক সব কষ্টেই ভোগতে হচ্ছে তাকে এ বয়সে। আমরা এমন্ত পরিস্থিতিতে কিছু বলার বা শান্তনা দেয়ার ভাষা খুজে পাচ্ছিলাম না।
.
আমাদের সকল পরিশ্রম ও প্রচেষ্টা তখন কিঞ্চিত হলেও স্বার্থক মনে হয়েছিলো যখন সামান্য কিছু ত্রাণ পাওয়াতে তাদের মুখে শত দুংখ-কষ্ট-বেদনা থাকা সত্বেও এক রাশ হাসি দেখেছিলাম।