মমিনুল ইসলাম বাবু, কুড়িগ্রামে: কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলগুলোতে চলছে অভিনব কায়দায় চিকিৎসা ব্যবস্থা। বিষহরা গান, মনষার জারি ও পদ্মপুরাণ পালার মাধ্যমে প্যারালাইসিস রোগীকে ঝাড়ফুঁক দিয়ে চলছে সুস্থ্য করার প্রাণান্তকর চেষ্টা। চিকিৎসা বিজ্ঞান যতই উন্নতির শিকড়ে উঠুক না কেন; এই অঞ্চলের মানুষ এখনো আছে পুরাতন ধ্যান ধারণায়। যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা, অধিক ব্যয় ও উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকায় প্রত্যন্ত পল্লী ও চরাঞ্চলের মানুষ এখনো এসব চিকিৎসার উপর নির্ভর করছে। ফলে চরের লোকজনের অজ্ঞতা ও সরলতার সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির মানুষ গ্রাম্য কবিরাজের পরিচয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে কষ্টার্জিত অর্থ।
সরজমিন কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নের চর দাগারকুটি এলাকায় গিয়ে দেখা গেল অভিনব দৃশ্য। মাঝবয়সী এক রোগীকে চৌকির উপর রেখে বিষহারার দলটি গোল হয়ে ঘুড়ছে। পুরোভাগে রয়েছেন প্রধান কবিরাজ। তার পেছনে ছয় সাগরেদ। সাগরেদদের পিছনে শেষ সারিতে রয়েছে গ্রামের কয়েকজন কিশোরী। তারা নৃত্য-গীতের মাধ্যমে পালা গাইতে গাইতে চারপাশটা ঘুড়ছে আর রোগীর শরীরে গাছের পাতা ছুঁইছেন। এ এক আজব কিসিমের চিকিৎসা পদ্ধতি। কমপক্ষে ৭ দিন থেকে সর্বোচ্চ ২১ দিন পর্যন্ত এই চিকিৎসার পর কলাগাছের ভেলা ভাসিয়ে দিয়ে আজীবন বিদায় দেয়া হয় রোগটিকে। গ্রামের কিশোরীদের মধ্যে স্বপ্না (১১) জানায়, নানীর সুস্থ্যতার জন্য ছোটবোন রত্না (৮)সহ দুই বান্ধবীকে নিয়ে বিষহরা নৃত্যে অংশ নিয়েছি। আমি চাই নানী ভাল হয়ে যাক।
কিশোরী স্বপ্নার বাবা মোহাব্বত আলী (৩৮) জানান, আমার শাশুরী মজিতা (৫৬) গত ৯ মাস ধরে বাসলি (প্যারালাইসিস) রোগে আক্রান্ত। তার একটি হাত ও পা অবস হয়ে গেছে। চলা ফেরা করতে পারে না। তাকে সুস্থ্য করার জন্য কুড়িগ্রাম ও রংপুর হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়। এজন্য ব্যয় হয় প্রায় লক্ষাধিক টাকা। কিন্ত অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তারা হতাশ হয়ে পড়েন। পরে গ্রামবাসীর পরামর্শ অনুযায়ী উলিপুরের ধড়ণীবাড়ী গ্রামের কবিরাজ শাহ আলমের সাথে যোগাযোগ করেন। তার দলের সাথে ৮ হাজার টাকার চুক্তি হয়েছে। এছাড়াও তিনবেলা তাদেরকে খাওয়াতে হবে। তারা ৭দিন ধরে পদ্মপুরাণ পালার মাধ্যমে ঝাড়বেন। এতে সুস্থ্য হলে ভাল। নাহলে দ্বিতীয় দফা বিষহরা জারির জন্য তাকে আরো ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা দিতে হবে। এই টাকা দিতেও রাজী মোহাব্বত আলী কিন্তু শর্ত একটাই শাশুরীকে সুস্থ্য করতে হবে। মজিতা বেওয়া ভাঙা-ভাঙা স্বরে জানান, নদী ভাঙনের চিন্তায় চিন্তায় শরীরটা হঠাৎ অসুস্থ্য হয়ে গেল। আমরা জামাই শাশুরী পার্শ্ববর্তী চরে ছিলাম। বসতভিটা ভাঙনের ফলে একত্রে দাগারকুটি চলে আসি। এখানে ১৫ হাজার টাকায় একবিঘা জমি বন্ধক নিয়ে মেয়ে-জামাইসহ একসাথে আছি। অসুস্থ্য হওয়ার পর বাইরে চিকিৎসা নেই। ভাল না হওয়াতে কবিরাজি চিকিৎসা নিচ্ছি। সাংবাদিক আসার খবর পেয়ে কবিরাজ শাহ আলম চা খাওয়ার কথা বলে সটকে পড়েন। মোবাইলে এই প্রতিনিধিকে জানান, এলোপ্যাথিক চিকিৎসায় ব্যর্থ হয়ে লোকজন আমার সাথে যোগাযোগ করে। এ পর্যন্ত আমি ৪০ থেকে ৪২জন রোগীকে সুস্থ্য করেছি। এ মাসেই ৩জন রোগীকে ভাল করেছেন বলেও দাবি করেন। উলিপুর উপজেলার ধরণীবাড়ী ইউনিয়নের লাঠির কামার গ্রামের খলিলুর রহমান ব্যাপারীর পূত্র শাহ আলম (৩৩) যুবক বয়স থেকেই এই কবিরাজি চিকিৎসা দিচ্ছেন। তার এই চিকিৎসা পদ্ধতির নাম বেহুলা ঝাড়নি। এই প্রক্রিয়া চলে সর্বনি¤œ ৭দিন থেকে সর্বোচ্চ ২১ দিন পর্যন্ত। দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা এবং রাত ৯টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত চলে এই অভিনব চিকিৎসা। এরসাথে চলে লতা-পাতা, গাছ-গাছরা দিয়ে বানানো ঔষধ দিয়ে মালিশ। এজন্য ৬জনের একটি দল থাকে যাদেরকে দিনমজুরী হিসেবে আড়াইশ’ টাকা প্রদান করতে হয়।
বিষহরা দলের সদস্য উপজেলার পান্ডুল এলাকার মাঈদুল-(২) জানান, হামরা কামলা চুক্তিতে কাম করি। দিন গেইলে কবিরাজ হামাকগুলাক ২শ’ টেহা করি দেয়। মুই ৫ বছর যাবৎ এই দলোত কাম করং।’ এই দলের পুরাতন সদস্য কার্তিক, আব্দুল আজিজ নেন আড়াইশ’ টাকা করে।
হাতিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল হোসেন জানান, এই অপচিকিৎসার জন্য দায়ি আমাদের অজ্ঞতা, আর্থিক দৈন্যতা ও যোগাযোগ সমস্যা। কুড়িগ্রামের উপর দিয়ে প্রায় ছোট-বড় ১৬টি নদ-নদী প্রবাহিত। এসব নদীতে চর রয়েছে প্রায় সাড়ে ৪ শতাধিক। এসব চরে প্রায় ৩ লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। এই বিশাল সংখ্যক মানুষের জন্য নেই কোন চিকিৎসা সু-ব্যবস্থা। ফলে চরের মানুষের সরলতাকে পূজি করে এক শ্রেণির কবিরাজ চিকিৎসার নামে প্রতারণা করে হাতিয়ে নিচ্ছে গরীব মানুষের সামান্য সঞ্চয়ও।
এ ব্যাপারে কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. আমিনুল ইসলাম জানান, এই চিকিৎসার কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। এটি আসলে সম্পূর্ণ একটি কুসংষ্কার। এই জাতীয় ঝাড়-ফুক কিংবা বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে যেসব প্যারালাইসিস বা জন্ডিস রোগীর চিকিৎসা করানো হয় তা সঠিক নয়। এগুলোর মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলের মানুষ প্রতারিত হচ্ছে। এজন্য আমরা স্বাস্থ্য শিক্ষা কার্যক্রম জোড়দারের মাধমে আমাদের স্বাস্থ্যকর্মী ও স্থানীয় এনজিওদের সমন্বয়ে এই অঞ্চলের মানুষের কুসংস্কার দূর করার জন্য সচেতনতামূলক কাজ করে যাচ্ছি।