শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইসলামী ছাত্রী সংস্থার কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মঙ্গলবার শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত আদেশ জারি করেছে। সংগঠনটির মাধ্যমে যাতে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে জঙ্গিবাদের বিস্তার ঘটতে না পারে সে জন্য এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানা
মন্ত্রণালয়ের আদেশে বলা হয়েছে, ‘সম্প্রতি ইসলামী ছাত্রী সংস্থা নামে একটি ছাত্রী সংগঠন কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রী ও সরলমনা ধর্মভীরু মহিলাদের মধ্যে জিহাদি মনোভাব সৃষ্টি করে প্রচলিত সংবিধানের বাইরে সমাজ প্রতিষ্ঠা তথা দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির হীন চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডের ফলে শিক্ষাঙ্গনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণসহ অরাজক পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। অনতিবিলম্বে এই অপচেষ্টা বন্ধ করা প্রয়োজন। তাই এরূপ (জিহাদি) কর্মকাণ্ড যাতে না ঘটে সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়া হল।’
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, একটি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদন ও সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্রী সংস্থার ব্যাপারে উল্লিখিত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. হেলাল উদ্দিন এ সংক্রান্ত নির্দেশনা জারির বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘আমাদের শাখা থেকে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ফাজিল ও কামিল পর্যায়ের মাদ্রাসার উদ্দেশে এ নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এবং ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়কে আলাদা চিঠি দেয়া হয়েছে।’
ইসলামী ছাত্রী সংস্থা জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রী ফ্রন্ট। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ জেলা ও থানা পর্যায়ে সংগঠনটি গত ৩৮ বছর ধরে নারীদের বিশেষ করে ছাত্রীদের সংগঠিত করে তাদের মধ্যে জিহাদি মনোভাব সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়ে আসছে। সরকারি বিশেষ করে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সজাগ তৎপরতার কারণে গত কয়েক বছর ধরে সংগঠনটি প্রকাশ্যে কার্যক্রম চালাতে না পারলেও গোপনে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।
পুলিশ জানায়, এসব কারণেই গত কয়েক মাস ধরে ছাত্রী সংস্থার তৎপরতার ওপর নজরদারি করা হচ্ছে। সর্বশেষ ১৯ আগস্ট রাজধানীর মেরুল বাড্ডা এলাকায় ইসলামিক ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে অভিযান চালায় পুলিশ। সেখান থেকে ছাত্রী সংস্থার ৫ নেতাকর্মীসহ বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়। যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসি কার্যকর হওয়া মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর স্ত্রী শামসুন্নাহার নিজামী এই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ। এর আগে গত ২৩ ও ২৪ জুলাই রাজধানীর ইডেন কলেজ থেকে জঙ্গি সন্দেহে ছাত্রী সংস্থার ৫ জনকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ। গত কয়েক বছরে জামায়াতে ইসলামীর বড় মগবাজারস্থ অফিস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল, ইডেন কলেজ, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল থেকে এ সংগঠনের বেশ কিছু নেতাকর্মী আইনশৃংখলা বাহিনীর হাতে আটক হয়েছে। আগস্টের মাঝামাঝি রাজধানীতে আটক জেএমবির চার নারী জঙ্গিও একসময়ে ইসলামী ছাত্রী সংস্থার কর্মী ছিল।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ছাত্রী সংস্থার কার্যক্রম নিয়ে সম্প্রতি একটি গোয়েন্দা সংস্থা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রতিবেদন জমা দেয়। ওই প্রতিবেদন গত ২৮ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এরপরই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রী সংস্থার কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে আদেশ জারি করা হল।
জানা গেছে, গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ছাত্রী সংস্থা নিষিদ্ধ ও কর্মীদের আটকসহ তিনটি সুপারিশ করা হয়। এতে বলা হয়, দেশের বর্তমান সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে গ্রামগঞ্জ ও স্কুল, কলেজভিত্তিক ইসলামী নারী সংস্থার কার্যক্রম বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে আইনশৃংখলা বাহিনী বা স্থানীয় প্রশাসনকে জোর সুপারিশ করা যেতে পারে। ছাত্রী সংস্থার কর্মীদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে আরও তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। ছাত্রশিবির ও ইসলামী ছাত্রী সংস্থায় যোগদানকে নিরুৎসাহিত করার জন্য সংবাদপত্র ও প্রচারমাধ্যমে জনসচেতনতামূলক অনুষ্ঠান প্রচার করা যেতে পারে।
১৯৭৮ সালের ১৫ জুলাই প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামী ছাত্রী সংস্থা। ইসলামী ছাত্রশিবিরের মতোই স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ, থানা, জেলা ও মহানগরে ছাত্রী সংস্থার কমিটি আছে।