সিসি ডেস্ক: সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য প্রস্তাবিত ‘সার্বজনীন পেনশন পদ্ধতি’র খসড়া কাঠামো চূড়ান্ত করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। অনুমোদনের জন্য শিগগিরই তা মন্ত্রিসভায় উত্থাপন করা হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, ২০১৮ সালের দিকে এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হতে পারে। তবে বর্তমান চাকুরেদের জন্য এ ব্যবস্থা প্রযোজ্য হবে না। যে বছর থেকে এটি কার্যকর হবে, তার পর যোগদানকারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে এ পদ্ধতি। অংশীদারিত্বমূলক এ ব্যবস্থায় চাকুরে এবং নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ উভয়েরই অবদান থাকবে। পেনশন খাতে ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের লাগাম টেনে ধরতে এবং স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করতে বিদ্যমান পেনশন ব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কারের অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, উদ্যোগ ভালো, তবে বাস্তবায়ন কঠিন হবে। এদিকে, প্রস্তাবিত পেনশন ব্যবস্থার বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা না থাকায় সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে সংশয় দেখা দিয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে পেনশন খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৬ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা। এ বরাদ্দ গত অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি। প্রতিবছরই এ খাত বাজেটের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়াও সামাজিক ঝুঁকিহ্রাসও বিবেচনায় রয়েছে সরকারের। বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবী প্রায় ১৫ লাখ, যা কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মাত্র ৫ শতাংশ। এরা পেনশন সুবিধা পান। অন্যদিকে, বেসরকারি খাতের ৯৫ শতাংশের মধ্যে মাত্র ৮ শতাংশ আনুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত রয়েছেন। তাদের কোনো পেনশন সুবিধা নেই। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের এক কর্মকর্তা বলেন, দেশে গড় আয়ু ও প্রবীণদের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে সামাজিকভাবে নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি বেড়েছে। এ ঝুঁকি মোকাবেলা ও সমতা বিধান করা সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এ জন্যই সার্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় প্রস্তাবিত ‘সার্বজনীন পেনশন পদ্ধতি’র খসড়া কাঠামোয় তহবিলের উৎস, পরিচালনা ও কর্মপদ্ধতি ইত্যাদি বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের মতামত নেওয়া হবে। জাতীয় সংসদে পাস হওয়ার পরই তা কার্যকর হবে। চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘোষণায় প্রথম এ উদ্যোগের কথা জানান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। ভারত, শ্রীলংকা ও অস্ট্রেলিয়ায় এ ধরনের ব্যবস্থা চালু রয়েছে। জানা গেছে, ভারতের সার্বজনীন পেনশন পদ্ধতির আদলে বাংলাদেশে এটি প্রবর্তন করা হচ্ছে। ২০০৪ সালে সীমিত আকারে চালুর পর এ ব্যবস্থা কার্যকর করতে সাত থেকে আট বছর সময় লেগেছে ভারতের। বর্তমানে কলকাতা ও আসাম ছাড়া বাকি সব রাজ্যে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, প্রস্তাবিত পেনশন তহবিল হবে ‘অংশীদারিত্বে’র ভিত্তিতে। অর্থাৎ চাকরিজীবী ও নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে এ তহবিলে অর্থ দেবে। এর পরিমাণ হতে পারে চাকরিজীবীর মূল বেতনের শতকরা ১০ ভাগ। নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষও সমপরিমাণ টাকা দেবে। সরকারি ও বেসরকারি খাতে একই নিয়মে তহবিল গঠন করা হবে। প্রস্তাবিত পেনশন স্কিমের আওতায় সরকারি চাকুরেদের বয়স হবে ৬০ বছর। আর বেসরকারি খাতের জন্য ৬৫ বছর। নির্ধারিত সময়ে চাকরি শেষে অর্ধেক পেনশনের টাকা এককালীন তুলতে পারবেন। বাকি টাকা তহবিলে থাকবে। এ তহবিল পরিচালনার জন্য আলাদা কোম্পানি গঠন করা হবে। তারা লাভজনক খাতে তহবিলের অর্থ বিনিয়োগ করবে। বিনিয়োগ সুরক্ষাও দেওয়া হবে। এ থেকে যে মুনাফা আসবে, তার অংশ মাসে মাসে পাবেন সুবিধাভোগীরা। পেনশনভোগীদের স্মার্ট কার্ড দেওয়া হবে। প্রস্তাবিত পেনশন স্কিমে ৫ থেকে ১০ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের সুবিধা থাকবে। সূত্র জানায়, সার্বজনীন পেনশন পদ্ধতির আওতায় বেসরকারি পর্যায়ে প্রাথমিকভাবে বড় বড় করপোরেট হাউস, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে কর্মরত চাকুরেদের আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য খাতের প্রতিষ্ঠানকেও আনা হবে।
বর্তমান নিয়মে একজন সরকারি চাকরিজীবী অবসরে যাওয়ার পর মোট পেনশনের শতভাগ তুলতে পারেন। এর মধ্যে অর্ধেক পেনশন নগদ হিসেবে উত্তোলন করেন। বাকি অর্ধেক মাসে মাসে নিতে পারেন অথবা একসঙ্গে তুলে নিতে পারেন। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় অর্ধেক পেনশন তোলার কথা বলা হয়েছে। বাকি অর্ধেক তহবিলে থাকবে, যা সরকার কর্তৃক নির্ধারিত খাতে বিনিয়োগ করা হবে। এ ব্যবস্থা কার্যকর হলে চাকুরেদের অবসরকালীন সুরক্ষা নিশ্চিত হবে বলে মনে করছে সরকার।
এ উদ্যোগ প্রসঙ্গে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, সার্বজনীন পেনশন পদ্ধতির উদ্যোগ ভালো। পৃথিবীর অনেক দেশেই এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এতে সরকারি-বেসরকারি পেনশনভোগীরা উপকৃত হবেন। সরকারের আর্থিক চাপ কমবে। ফলে এখানে যে অর্থ সাশ্রয় হবে, তা উন্নয়ন খাতে ব্যয় করা যাবে। তবে সরকারি খাতে সহজ হলেও বেসরকারি খাতে এটির বাস্তবায়ন কঠিন হবে বলে মনে করেন তিনি। কারণ, বেসরকারি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করতে হবে সরকারের। তারা রাজি না হলে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তা ছাড়া বেসরকারি পর্যায়ে পেনশন তহবিল পরিচালনা করাও কঠিন হবে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) পরিচালক ড. জায়েদ বখত বলেন, সরকারি খাতে সমস্যা না হলেও বাধা আসতে পারে বেসরকারি খাত থেকে। কারণ, দেশে বেসরকারি খাতের বেশির ভাগ কোম্পানিই ছোট। অনেক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপত্রও দেওয়া হয় না। এ অবস্থায় বেসরকারি চাকরিজীবীদের প্রস্তাবিত পেনশন সুবিধার আওতায় আনা কঠিন হবে। তবে সীমিত আকারে চালু করা যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
এদিকে, সরকারি কর্মচারী কল্যাণ ফেডারেশনের মহাসচিব হেদায়েত হোসেন বলেন, প্রস্তাবিত পেনশন পদ্ধতি সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না। তবে মোট পেনশনের ৫০ শতাংশ তোলার যে নিয়ম করা হয়েছে, তা আমরা চাই না। এটা হলে দীর্ঘ সময় পেয়ে আসা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন সরকারি চাকরিজীবীরা। শিগগিরই সভা ডেকে নিজেদের মতামত সরকারকে জানানো হবে বলে জানান তিনি। বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী সমন্বয় পরিষদের সাবেক সভাপতি মো. হানিফ ভূঁইয়া বলেন, সবার সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
উৎস: সমকাল