মোঃ সাহবাজ উদ্দিন সবুজ: জালিমের হাতে মজলুম ও অসহায় নারী, নিষ্পাপ শিশু আর নিরস্ত্র আল্লাহবিশ্বাসীদের পাক খুনে লেখা আখ্যানই কারবালা। প্রিয় নবী সা:-এর আদরের দৌহিত্র, নয়নমণি, মা ফাতেমার নাড়ীছেঁড়া ধন সায়্যিদ হুসাইন রা:-এর ত্যাগ-বিসর্জন ও তার নির্মম শাহাদতের কাহিনীতে আমরা মহররমের ১০ তারিখে বাষ্পরুদ্ধ হয়ে যাই। নিঃসন্দেহে এটি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সা:-এর প্রতি ঈমানের স্বাভাবিক প্রতিফলন এবং মানবতার প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। এটি নিছক একটি হত্যাকাণ্ডই ছিল না, বরং এ হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে ইসলামের ইতিহাস তার সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে অন্য দিকে মোড় নিয়েছিল। এ হত্যাকাণ্ড যতটুকু বেদনাদায়ক তার চেয়েও বেদনাদায়ক হলো ইসলাম ও ইসলামি জীবনব্যবস্থা রাসূল সা: কর্তৃক প্রদর্শিত যে রাস্তা বেয়ে পথ চলছিল, সেটি ইমামের হত্যার মাধ্যমে বাঁকা পথে মোড় নেয়। আশুরায় প্রেরণার একটি বাতিঘর রয়েছে, যেটিকে পাশ্চাত্য ও দেশীয় ইসলামবিদ্বেষী গোষ্ঠী ভেঙে তথায় একটি রঙিন বাতিঘর স্থাপন করেছে। যাতে মুসলমানেরা কোনো দিন সে প্রেরণায় উজ্জীবিত হতে না পারে। মুসলমান ষড়যন্ত্রমূলক রঙিন সেই বাতিঘরের ধাঁধায় পড়ে ইমামের প্রতি সস্তা ভালোবাসা প্রকাশে মাতম করে করে শুধু বুকই চাপড়িয়েছে। কিন্তু সঠিক প্রেরণার ইতিহাস তারা জানতে পারেনি এবং নিজেদের উজ্জীবিত করতে পারেনি। মহররমের মূল চেতনার সেই ইতিহাসের পাতা থেকে বিশ্ব মুসলিমকে ছিটকে ফেলে দেয়া বা বিস্মৃত করার পাশ্চাত্য টার্গেট সফল হয়েছে। এই সফলতার কারণেই এ দিনের অসংখ্য ঘটনার মধ্যে একটিমাত্র চেতনা যা মুসলমানদের জানা ও উপলব্ধি করা একান্তই প্রয়োজন ছিল, সেটিকে বাদ দিয়ে আমাদের সম্মানিত ইমাম সাহেবরা তা চেপে যান। তারা সঠিক চেতনার ইতিহাসটি বলার সাহস করেন না বা কালের বিস্মৃত ইতিহাসের কবলে তারাও নিমজ্জিত। ফলে শুধু মুখরোচক ও উত্তেজিত ঘটনাগুলো বর্ণনা করে একান্তই কিসসা-কাহিনীর মতো সাময়িকভাবে মজাদান করা হয়। তাদের নিমিত্তে অনুরোধ মহররমের বিস্মৃত স্মৃতিকে মন্থর করুন।
জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ক্ষমতায় টিকে থাকা স্বৈরাচারী শাসকের বিরুদ্ধে সঙ্ঘবদ্ধ প্রতিবাদ হয়েছে
ফোরাতের তীরে কারবালার ময়দানে। ইমাম হোসাইনকে শহীদ করা সম্ভব হয়েছে কিন্তু তার আদর্শকে হত্যা করা সম্ভব হয়নি। এটা দেখেই বলা হয়, প্রতিটা কারবালার পরেই ইসলামের পুনর্জন্ম হয়েছে। যেখানেই ইয়াজিদের উদয় হয়েছে, সেখানেই ইমাম হোসাইনের চেতনা জাগ্রত হয়েছে। সত্য ও ন্যায়, সাম্য ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য স্বৈরাচারী ইয়াজিদের বিরুদ্ধে ইমাম হুসাইন রা: যেভাবে বীরবিক্রমে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন, ত্যাগ চিরকাল দেশে দেশে যুগে যুগে এ ধরনের সঙ্কট ও সমস্যা উত্তরণের ব্যাপারে অনুপ্রেরণা হয়ে কাজ করবে।
ইতিহাস জানিয়েছে, স্বৈরাচারেরা যুগে যুগে এসেছে, সামনেও আসবে। এমনি এক জগদ্দল স্বৈরাচারের কবলে পড়েছে গোটা বিশ্ব। আশুরার চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে বিশ্বের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়া এখন সময়ের দাবি। এই যুগের ইয়াজিদ দেশে দেশে নব্য অনেক কারবালা সৃষ্টি করেছে। একজন মুমিন বা মুসলমানের কিংবা ইসলাম অনুসারীর কাছে প্রতিদিনই ইমাম হুসাইনের মতো সত্য-মিথ্যার মুখোমুখি দাঁড়ানোর দিন। প্রতিদিনই মিথ্যার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে শহীদ হওয়ার দিন। সত্যকে সব কিছুর ঊর্ধ্বে তুলে ধরে সর্বোচ্চ ত্যাগ- কোরবানির দিন। কারবালা শুধু ইরাকের একটি ভূখণ্ডের নাম নয়, শহীদী ঈদগাহ। পৃথিবীর সর্বত্র এমন সব স্থানই কারবালার সাথে তুল্য, যেসব স্থানে ইমাম হোসেনের মতো আপসহীন অনুসারীরা অসমযুদ্ধে জান দিয়ে সত্য প্রতিষ্ঠায় অনুসরণীয় ইতিহাস সৃষ্টির ঘটনা ঘটাতে থাকবে। এ ধরনের ত্যাগ-কোরবানি, জেল-জুলুম ও নির্যাতন নিপীড়নের পথ ধরেই ইসলাম যুগে যুগে পুনর্জীবন লাভ করেছে এবং ভবিষ্যতেও করবে। ইয়াজিদ কেড়ে নিয়েছিল খলিফা নির্বাচন, অর্থাৎ পরামর্শভিত্তিক দেশ পরিচালনার জন্য নেতা নির্বাচনের অধিকার। ইয়াজিদই চালু করেছিল বংশীয় ধারার রাজতান্ত্রিক শাসন। একই সাথে জনগণের অর্থের আমানতগার বায়তুলমালের ওপর একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল ইয়াজিদ। যুগ যুগ ধরে একই শ্রেণীর শাসক একইভাবে ভূমিকা পালন করে চলেছে। তাই জালেম ও মজলুমের, শাসক ও শাসিতের লড়াই চিরন্তন। এই চিরায়ত লড়াইয়ে কে হবেন হুসাইন-দিলের মানুষ, কে হবে ইয়াজিদের মতো কিংবা সিমারপ্রাণ, তা কেউ নিজেই ঠিক করে নেবেন, কাউকে সৃষ্টিকর্তা সেই স্তরে নামিয়ে দেবেন কিংবা উন্নীত করবেন।
বীর আলীর বীরপুত্র যে চেতনা নিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে নড়ে উঠেছিলেন, যে দ্রোহ ও ক্ষোভ নিয়ে অগ্নিময় হয়ে উঠেছিলেন সেই গর্জন আমাদের মাঝেও উদ্ভাসিত করতে হবে। আজকের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আমাদেরও বারবার বলতে ইচ্ছে করে, বিশ্বাসসিক্ত প্রত্যেক মানুষের কাছে প্রতিটি দিনই ১০ মহররম, অর্থাৎ আশুরার স্মরণীয় কিংবা কারবালার মতো বিষাদময়, কিন্তু মহিমান্বিত। আবার প্রতিটি জমিন বা মজলুম মানুষের জনপদই কারবালার মাঠের মতো। প্রতিদিনই হুসাইন-দিল প্রাণ দিচ্ছে। একই সাথে পাপাত্মা ইয়াজিদ বাহিনীর তালিকাও প্রলম্বিত হচ্ছে। সময় এসেছে হুসাইনি চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নব্য ইয়াজিদদের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠার, তাদের মুনাফেকি ও কুফরি চেহারা উন্মোচন করার। এটাই যেন আমাদের শপথ হয়, আমরা যেন প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বকে একটি সুখী-সমৃদ্ধশালী, কল্যানমুখী মুসলিম দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে পারি, সেই অঙ্গীকারই হোক আমাদের পাথেয়। আজ আশুরার এই দিনে আমাদের শপথ নিতে হবে নতুন হুসাইন তৈরি করার। অন্যথায় মুসলিম উম্মাহ নব্য ইয়াজিদদের তপ্ত আগুনে জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যাবে। ইসলামি রাষ্ট্রের বুনিয়াদি নীতি সংরক্ষণের জন্য ইমামের শাহাদত ছিল এক ঐতিহাসিক নজরানা। আমাদেরকে প্রথমত ইসলামি সমাজ বিনির্মাণের পথে এগিয়ে আসতে হবে। তবেই ইমামের প্রতি ভালোবাসার যথার্থতা প্রকাশ পাবে। মনে রাখতে হবে, এ পথে বাদ সাধবে পৃথিবীর তাবৎ তাগুতি শক্তি ও কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী। ইমাম হোসাইন রা:-এর মতো দৃঢ় ঈমান নিয়ে আমাদেরকে এসব শক্তির মোকাবেলায় এগিয়ে যেতে হবে। অনেক পাঠক জানতে চান, আমাদের কী হবে? তাদের প্রতি সেই একটাই সান্ত্বনা, কারবালার স্বাদ যখন পেয়েছেন, বিজয়ের স্বাদ অবশ্যই পাবেন। ইনশাআল্লাহ
(লেখকঃ তরুণ লেখক ও সংগঠক)