• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১১ অপরাহ্ন |

অক্সিজেনে চলছে সোনালী ব্যাংক

সিসি ডেস্ক: ২০১৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোনালী ব্যাংকের নিট মুনাফা ৫৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। ওই বছরে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি বাবদ পরিচালন মুনাফা থেকে এক হাজার ৯৬০ কোটি টাকা রাখার কথা ছিল। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ বিবেচনায় ছাড় দেওয়ায় প্রভিশনের ৭০ শতাংশ, অর্থাৎ এক হাজার ৩৭২ কোটি টাকা মুনাফা থেকে অন্য হিসাবে নিতে হয়নি। একইভাবে আদালতে রিটকৃত ঋণের বিপরীতে ৫২৫ কোটি টাকা ও বিনিয়োগের বিপরীতে ১৬৬ কোটি টাকা আলাদাভাবে রাখা থেকেও অব্যাহতি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থাৎ এই তিন খাতে ব্যাংকটিকে দুই হাজার ৬৩ কোটি টাকা বাধ্যতামূলকভাবে আলাদা জমা রাখা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এসব অব্যাহতি দেওয়া না হলে গত বছর ব্যাংকটির মুনাফার পরিবর্তে নিট লোকসান হতো দুই হাজার চার কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করেন, এভাবে ব্যাংকিং নিয়মনীতির বিভিন্ন বিধিবিধানের ছাড় ও সরকারি সহযোগিতায় অক্সিজেন নিয়ে বেঁচে আছে সরকারি খাতের বৃহত্তম ব্যাংক সোনালী ব্যাংক। হলমার্ক কেলেঙ্কারির মতো বড় অনিয়ম থেকেও ব্যাংকটি শিক্ষা নিতে পারেনি। প্রায়ই ব্যাংকিং রীতি ও আইন-কানুনের ব্যত্যয় ঘটছে। সোনালী ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদন এবং ব্যাংকটির ওপর পরিচালিত বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ বিশদ পরিদর্শন প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে। সার্বিক বিবেচনায় সোনালী ব্যাংকের ক্যামেলস রেটিং দাঁড়িয়েছে ৪, অর্থাৎ ব্যাংকটিকে প্রান্তিক মানের হিসেবে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ক্যামেলস রেটিংয়ের সবচেয়ে খারাপ অবস্থা হচ্ছে ৫। বিভিন্ন ছাড়ের সুবিধা নিয়ে ব্যাংকিং মানের সবচেয়ে খারাপ অবস্থার আগের ধাপে রয়েছে এই ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে দেখা গেছে, ২০১২ সালে হলমার্ক কেলেঙ্কারির মতো ঘটনা উদ্ঘাটনের পরও ঋণ বিতরণে অনিয়ম থেমে নেই। ঋণ পুনঃতফসিলে অনিয়ম হচ্ছে দেদার। ঋণ অবলোপন ও সুদ মওকুফের বেলায় অনেক ক্ষেত্রে মানা হয়নি নিয়মকানুন। কর্মকর্তাদের জাল-জালিয়াতি অব্যাহত রয়েছে। খেলাপি ঋণ আদায় হচ্ছে না। প্রতি মাসে নতুন নতুন মামলায় জড়িয়ে পড়ছে ব্যাংক। ব্যাংকটির আমানত-প্রবাহ ঠিক

থাকলেও তার বড় অংশ এসেছে কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে। ফলে তারল্য সংকটের ঝুঁকি রয়েই গেছে। সুদবাহী আমানতের বোঝা কোনোভাবেই কমছে না। সরকার মূলধন সরবরাহ করলেও ঘাটতি দূর হচ্ছে না। একক ঋণগ্রহীতার সীমা অতিক্রম করে ঋণ দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

মূলধন সংরক্ষণেও সোনালী ব্যাংককে ছাড় দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধন সংরক্ষণে গত বছর দুই হাজার ৬৩ কোটি টাকা ছাড় দেওয়া হয়। ছাড় না দিলে ব্যাংকের মূলধন সংরক্ষণের হার দাঁড়াত ৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ। নিয়ম অনুযায়ী ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের নূ্যনতম ১০ শতাংশ মূলধন রাখতে হয়। আবার সরকার ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি মেটাতে ২০১৫ সালে ৭১০ কোটি টাকা দিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দিন আহমেদ মনে করেন, সোনালী ব্যাংককে দেওয়া বিভিন্ন ছাড় দীর্ঘদিন অব্যাহত রাখলে ব্যাংকটির দক্ষতার ঘাটতি দূর হবে না; উন্নতিও হবে না। ব্যবস্থাপনাসহ অন্যান্য পর্যায়ে দক্ষতা উন্নয়নে বাজার প্রতিযোগিতার মধ্যে থাকা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

সোনালী ব্যাংক শুধু গত বছর বিভিন্ন ছাড় পেয়েছে তা নয়, এর আগে ২০১৪ সালেও ব্যাংকটি একই ধরনের ছাড়ের পরিপ্রেক্ষিতে ৬০৫ কোটি টাকা নিট মুনাফা দেখায়। ওই বছর ছাড় দেওয়া না হলে ব্যাংকটির নিট লোকসান হতো এক হাজার ৩১৬ কোটি টাকা। আর ২০১৩ সালে ব্যাংকটি এত বেশি ছাড় পেয়েছে যে পরিচালন মুনাফার চেয়ে নিট মুনাফা বেশি দেখিয়েছে। ব্যাংকটির ওয়েবসাইটে দেওয়া ২০১৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে পরিচালন মুনাফা ছিল ২৯৭ কোটি টাকা। কিন্তু ওই বছর সোনালী ব্যাংক নিট মুনাফা দেখিয়েছে ৩৫৮ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মো. রাজী হাসান সমকালকে বলেন, এভাবে একটা ব্যাংক চলতে পারে না। ছাড় দেওয়া হয়েছে, আবার চাপও দেওয়া হচ্ছে, যাতে ব্যাংকটি ভালো করে। তবে অনির্দিষ্টকাল এসব সুবিধা অব্যাহত রাখা যাবে না। এ জন্য ব্যাংকটিকে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রেখেছে।

এসব বিষয়ে সোনালী ব্যাংকের বক্তব্য জানতে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদের অফিসে যোগাযোগ করা হলে তিনি দেখা করেননি। মোবাইল ফোনে বারবার কল করে এবং এসএমএস দিয়েও সাড়া পাওয়া যায়নি। সবশেষে ব্যাংকটির প্রধান তথ্য কর্মকর্তা মহাব্যবস্থাপক মোফাজ্জল হোসেনের মাধ্যমে লিখিত আবেদন করেও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মতামত পাওয়া যায়নি।

কেন এই ছাড় :বাংলাদেশ ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হলমার্ক কেলেঙ্কারির পর ব্যাংকটির ভাবমূর্তি রক্ষায়, বিশেষ করে ব্যালান্সশিট ইতিবাচক দেখাতে নানা ক্ষেত্রে ছাড় দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকটি সরকারের এবং বেসরকারি অনেক বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানের আমদানি-রফতানির কাজ করে থাকে। বিশ্ববাজারে ব্যাংকটির ভাবমূর্তি নেতিবাচক হলে এসব প্রতিষ্ঠানের এলসি খোলাসহ অন্যান্য লেনদেনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এ ছাড়া দেশের লাখ লাখ সাধারণ মানুষের আমানত রয়েছে এই ব্যাংকে। সব প্রভিশন সংরক্ষণ করতে গেলে ব্যাংকটির স্বাভাবিক লেনদেন করার ক্ষমতা কমে যেত। এ ধরনের কোনো পরিস্থিতি যাতে সৃষ্টি না হয়, সে জন্য এই ছাড় দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ এবং ব্যাংক পরিদর্শন বিভাগ সোনালী ব্যাংকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ সুবিধা দিয়েছে। তবে ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব সুবিধা উল্লেখ করার শর্ত দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

নানা অনিয়ম :বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটির দিলকুশা করপোরেট শাখার গ্রাহক মেসার্স লীনা পেপার মিলস লিমিটেডের (ইউনিট-১) আট কোটি টাকার এলটিআর ঋণ মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পর তা পুনঃতফসিল না করে পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনক্রমে দুই দফায় ঋণ পরিশোধের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। রমনা করপোরেট শাখার গ্রাহক ফেয়ার অ্যান্ড ফেব্রিকস লিমিটেডকে কয়েক বছর ধরে ব্যাংক টু ব্যাংক এলসি স্থাপনের মাধ্যমে অনিয়মিতভাবে ১১৫ কোটি টাকার ফোর্সড লোন দিয়েছে, যা বর্তমানে ২৯১ কোটি টাকায় পরিণত হয়েছে। প্রতিবছরই আগের বছরের ফোর্সড লোন অপরিশোধিত থাকা অবস্থায় এই প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ব্যাক টু ব্যাক এলসি স্থাপন করা হয়েছে। একইভাবে এই গ্রাহকের পরিবারভুক্ত অপর প্রতিষ্ঠান কৃষি ব্যাংকের গ্রাহক মেসার্স বিটস ফ্যাশনস লিমিটেড থেকে ভুয়া কাগজপত্রের ২০ কোটি টাকার স্থানীয় রফতানি বিল কিনে আইবিপি ঋণ সৃষ্টি করা হয়েছে। খুলনার দৌলতপুর কলেজ রোড শাখা আটটি প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া কাগজপত্রে ১০ কোটি টাকা পিসিসি ঋণ দিয়েছে। ব্যাংকটির ৪১৩তম পর্ষদ সভায় চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট শাখার গ্রাহক মেসার্স শাহ আমানত নিটিং অ্যান্ড ডাইং ইন্ডাস্ট্রিজকে এক বছরের জন্য ১২ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করা হয়। কিন্তু এই ঋণপ্রস্তাব অনুমোদনের জন্য পর্ষদ সভায় যে স্মারক উপস্থাপন করা হয়েছে, তাতে কোম্পানির প্রকল্প বাস্তবায়ন অবস্থা এবং প্রতিষ্ঠানটি ঋণ পরিশোধে সক্ষম কি-না এসব কিছুই উল্লেখ করা হয়নি। ব্যাংকটির খুলনার দৌলতপুর শাখার গ্রাহক এ কে জুট ট্রেডিংয়ের ঋণের বিপরীতে নিয়ম অনুযায়ী যে পরিমাণ মালামাল গুদামে রাখার কথা ছিল, প্রতিষ্ঠানটি তার চেয়ে ৩২ কোটি টাকার কম মালামাল রেখেছে। এরপরও ওই অর্থ আদায়ে কোনো উদ্যোগ নেয়নি ব্যাংক। এমনকি ওই ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। সে ক্ষেত্রেও অনিয়ম করেছে ব্যাংক। ওই গ্রাহকের ঋণস্থিতির ১৫ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দেওয়ার কথা থাকলেও তা নেয়নি ব্যাংক। এর পর আরও ৩৫ কোটি টাকা নতুন ঋণ দেওয়া হয়েছে। এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যাংক কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

জানা গেছে, ২০১৫ সালে ব্যাংকটির পাঁচটি শাখায় নয় কোটি ৩২ লাখ টাকার জাল-জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। এসব প্রতারণা ও জাল-জালিয়াতির সঙ্গে ১৯ কর্মকর্তা জড়িত। জড়িত কর্মকর্তাদের মধ্যে দু-একজন ছাড়া অন্যদের বিরুদ্ধে ব্যাংক চূড়ান্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ব্যাংকটিতে কার্যকর মনিটরিং বা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা নেই বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শক দল।

তারল্য সংকটের আশঙ্কা :ব্যাংকের মোট আমানতের মধ্যে বেশি সুদবাহী আমানত বেশি। মোট আমানতের ১৫ দশমিক ২২ শতাংশ বা ১২ হাজার ৫৬৯ কোটি টাকা মাত্র ১০টি সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, এসব আমানতের মধ্যে দু-একটি আমানত তুলে নেওয়া হলে ব্যাংকটি তারল্য সংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে ঋণ বিতরণ বাড়ছে না ব্যাংকের। ফলে ব্যবসা বৃদ্ধি পায়নি।

উৎসঃ   সমকাল


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ