• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩০ অপরাহ্ন |

নীলফামারীতে সরকারি বরাদ্দকৃত সার পাচ্ছে না কৃষকরা

সিসি নিউজ ।। বিসিআইসি’র ডিলার কর্তৃক সরকারী বরাদ্দকৃর্ত সার কাগজে-কলমে উত্তোলন করে কৃষকদের মাঝে বিতরণ করছে না। কৃষি বিভাগের এক শ্রেনীর কর্মকর্তার যোগসাজশে তা কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘ ৭/৮ বছর ধরে এ কার্যক্রম চলমান থাকলেও কৃষকরা জানেনা ডিলার পয়েন্টের সার বিক্রির অবস্থান। অথচ এসব দেখভালের জন্য রয়েছে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি। ফলে সরকারের দেয়া সুযো-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে নীলফামারী জেলার কৃষক।

নীলফামারী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র মতে, জেলার ৭৫টি পয়েন্টে প্রতি মাসে নির্দ্দিষ্ট মূল্যে সার বিক্রির জন্য অনুমোদিত ৭৫জন ডিলার রয়েছেন। এসব ডিলার ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি ও ডিএপি সার উত্তোলন করে কৃষকদের মাঝে তা বিতরণ করেন। জেলা ও উপজেলা শহর এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে একাধিক ডিলার এসব সার বিক্রি করছেন। গত জুলাই মাসে ডিলারগণ ২ হাজার ৫২৬ মে. টন ইউরিয়া, টিএসপি ২৭৮ মে. টন, এমওপি ১ হাজার ৩০১ মে. টন ও ডিএপি ৮৯৬ মে. টন উত্তোলনের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়। চলতি আগষ্ট মাসে ডিলারদের জন্য বরাদ্দকৃত সারের মধ্যে রয়েছে ৫ হাজার ২৬২ মে. টন ইউরিয়া, টিএসপি ৩২৫ মে. টন, এমওপি ১ হাজার ৫৭১ মে. টন ও ডিএপি ৮৩৮ মে. টন। যা আগামী ৩১ আগস্টের মধ্যে উত্তোলন করে কৃষকদের মাঝে বিতরণ করা হবে। ইতিমধ্যে ডিলারগণ উত্তোলন করেছেন বলে সূত্রটি নিশ্চিত করেছে।

কিন্তু অভিযোগ উঠেছে জেলার বিভিন্ন পয়েন্টে সরকারি বরাদ্দকৃত সার পাচ্ছে না কৃষকরা। নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার কাশিরাম ইউনিয়নের ডিলার পয়েন্টের অবস্থানই জানেনা সেখানকার দুই সহস্রাধিক কৃষক। মঙ্গলবার বিকেলে ওই ইউনিয়নের হাজারীহাটে হঠাৎ করে ইউরিয়া সারের ছোট ট্রাক ঢুকতে দেখে বিষয়টি জানাজানি হয়ে যায়। এ সময় ডিলার পয়েন্টে দুই শতাধিক কৃষক উপস্থিত হয়ে সার আনলোডে বাধা দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘ ৭/৮ বছর যাবত ডিলার পয়েন্টে ডিলার সার বিক্রি না করে কালো বাজারে বিক্রি করে দেয়। ফলে কৃষক বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত দামে সার কিনে জমিতে ব্যবহার করতে বাধ্য হয়।

উপস্থিত কৃষকদের মধ্যে পরজা পাড়ার মো. রনজু, হুগলিপাড়ার জোবাইদুল ইসলাম, জেলে পাড়ার অনীল চন্দ্র দাস অভিযোগ করেন যে, বিসিআইসি’র হাজারীহাটের রাসায়নিক সার ডিলার মেসার্স লাকী ট্রেডার্স এর স্বত্বাধিকারী মিসেস সালেহা বেগম সার উত্তোলন করে কালো বাজারে সার বিক্রি করে দেন। সে কারণে তার কাছ থেকে এলাকার কোন কৃষকই সার পান না। সরকার সার বরাদ্দ দেয় কৃষকদের। অথচ ডিলাররা তা তসরুফ করে সরকারি সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করেছে এ এলাকার কৃষকদের।

কৃষকরা আরো জানান, এবারও সেইভাবে সার তুলে গুদামজাত করার খবর পেয়ে এলাকার কৃষকরা সমবেত হয়েছি। আগে আমাদেরকে সার দিতে হবে। তারপর গুদামে রাখা হোক। কারণ গুদাম থেকে এসব সার গোপনে বিক্রি করে দেওয়া হবে এটা নিশ্চিত। কারণ ডিলার সোমবার (৯ আগস্ট) হাজারীহাটের আব্দুস সালামের দোকান ভাড়া নিয়েছে মাত্র এক মাসের জন্য। এরপর হয়তো সে আবারও গা ঢাকা দিবে। তারা শহরে থাকে। আমরা তাদের কখনোই কাছে পাইনা।

এমতাবস্থায় ট্রাক থেকে আনলোড করতে না পেয়ে ডিলার সালেহা বেগমের ছেলে প্রিন্স মাহমুদ বিষয়টা কৃষি বিভাগকে জানালে উপজেলা কৃষি অফিসার শাহিনা বেগম, কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মমতা সাহা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। কিন্ত পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেয়ে থানায় খবর দেয়া হয়। পরে সৈয়দপুর থানার এসআই রেজাউল করিম সঙ্গীয় ফোর্স সহ এসে ৩ ঘন্টা পর সন্ধ্যা ৬টায় পরিস্থিতি সামাল দেয়।

ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বজলুল চৌধুরী বুলবুল বলেন, কৃষি অফিসের লোকজনের কারণেই ওই ডিলার এমন ঘাপলা করার সাহস পেয়েছে। কৃষকের সার পয়েন্টে না আনার পরও কিভাবে তার ডিলারশীপ বহাল তা খুবই আশ্চর্যজনক ব্যাপার। কয়েক দিন যাবত কৃষকরা তাদের সমস্যার কথা আমাকে জানান। তাই কৃষকদের কথা ভেবে বিভিন্ন অফিসে যোগাযোগ করার চেষ্টা করি। তারই প্রেক্ষিতে কৃষি অফিস এবার বাধ্য হয়ে ডিলার পয়েন্টে সার নিয়ে এসেছে। এখন এই সার কৃষকদের মাঝে সঠিকভাবে বিক্রি করে এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে।

সৈয়দপুর উপজেলা কৃষি অফিসের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মাহুবুবর রহমান জানান, ওই ইউনিয়নের দায়িত্বে দীর্ঘ তিন বছর থেকে আছি। কিন্তু কোন দিন ডিলারদের সার বিক্রি করতে দেখিনি। ডিলারদের নাম ও তালিকা জানি কিন্তু তাদেরকে চিনি না। ইউনিয়নে চওড়া বাজার ও সিপাইগঞ্জ বাজার আরো দুটি পয়েন্ট রয়েছে, সেগুলোর অবস্থা একই।

সৈয়দপুর উপজেলা কৃষি অফিসার ও উপজেলা সার-বীজ বিতরন ও মূল্যায়ণ কমিটির সদস্য সচিব শাহিনা বেগম জানান, কৃষকরা সার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন এ অভিযোগটা সঠিক নয়। এতোদিন তাহলে ওই এলাকার কৃষকরা কিভাবে সার পেয়েছে? আসলে ওই ডিলার নিজের পয়েন্টে সার বিক্রি না করে অন্য একটি দোকানে বিক্রি করায় এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। প্রতি মাসে চাহিদা অনুযায়ী সারের বরাদ্দ দেয়া হয় ডিলারদের।

জেলার কিশোরগঞ্জ উপজেলার বাহাগিলি ইউনিয়নের কৃষকদের সার বিতরনের জন্য মনোনীত ডিলার মেসার্স দেলোয়ার ট্রেডার্স। তিনি সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নে বিক্রির না করে উপজেলা সদরে বিক্রয়ের পয়েন্ট করেছেন। যা ওই ইউনিয়ন থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান। কৃষক মজিবর রহমান, আলমগীর হোসেন জানান, সরকারীভাবে ডিলার পয়েন্ট সার বিক্রয়ের বিষয়টি জানিনা বা জানানো হয়নি। তাছাড়া এতো দূর থেকে সার ক্রয় করা কি সম্ভব?

কিশোরগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসার ও উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব হাবিবুর রহমান জানান, বাহাগিলি ইউনিয়নে ওই ডিলারের পয়েন্টে যাওয়ার রাস্তা খুবই নাজুক। তাই সদরে পয়েন্টটি করা হয়েছে।

একই অবস্থা নীলফামারী সদরের সোনারায় ইউনিয়নের বাবুরহাটের ডিলার সরকার এন্টার প্রাইজের। সেখানে কোন সাইনবোর্ড বা বিতরণের জন্য সার মজুতের ঘর নেই। ফলে এ পয়েন্টের খবর ওই ইউনিয়নের কৃষকরা জানেন না। ডোমার, ডিমলা ও জলঢাকা উপজেলার কিছু ইউনিয়নের ডিলারদের চিত্র ভিন্ন নয়।

নীলফামারী জেলা প্রশাসক ও জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি হাফিজুর রহমান চৌধুরী জানান, কৃষকরা বিসিআইসি’র ডিলারের কাছ থেকে সার পাচ্ছেনা- এমন অভিযোগ তিনি পাননি এবং বিষয়টি তাকে জানানো হয়নি। ডিলার নির্দিষ্ট পয়েন্টে প্রাপ্ত সার বিক্রি না করলে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন বলে জানিয়েছেন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ