বিশেষ প্রতিনিধি।। নীলফামারীর সৈয়দপুর রেলক্রসিং থেকে নীলফামারীর সদর পর্যন্ত ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক চালান নুর মোহাম্মদ। এ সড়কে যাতায়াত করতে প্রতিদিন তাকে ৩০ টাকা দিয়ে টোকেন নিতে হয়। টাকা না দিলে এ সড়কে গাড়ি চালানো বন্ধ।
নুর বলেন, ‘আবার ঘুরে এসে দিচ্ছি এমন আবদারও টেকে না। আগের দিনের আয় থেকেই চাঁদার টাকা রেখে দিতে হয়। ’ শুধু এ সড়কেই নয় উপজেলায় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি সড়কে গাড়ি নিয়ে ঢুকতে চাঁদা দিয়ে নিতে হয় পৃথক টোকেন। এজন্য সেখানকার প্রতিটি পয়েন্টে বা স্টান্ডে রয়েছে চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের নিয়োগ দেওয়া পৃথক লাইনম্যান। ব্যাটারিচালিত রিকশা, পায়ে চালানো রিকশা, পিকআপ, বাস, টেম্পো কোনো কিছুই নেই চাঁদার বাইরে। সংশ্লিষ্ট এলাকার থানা-পুলিশকে ‘ম্যানেজ’ করেই এ চাঁদাবাজি করা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
গত রোববার রংপুরের র্যাব-১৩ সৈয়দপুর বাস টার্মিনাল এলাকায় অভিযান চালিয়ে ইজিবাইক বাস, পিকআপ, ড্রামট্রাকসহ অন্যান্য যানবাহন থেকে চাঁদা নেওয়ার অভিযোগে ৫ জন গ্রেপ্তার করে। জেলার কিশোরগঞ্জ থেকে গতকাল সোমবার রাতে গ্রেফতার করা হয় ৪ জনকে।
নীলফামারী বিআরটিএ সূত্র জানায়, প্রতিদিন সৈয়দপুর থেকে দিনাজপুর, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন রুটে চলাচল করে দুই শতাধিক যাত্রীবাহী কোচ। সব মিলিয়ে চলাচলকারী যানবাহনের সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি মাসে পরিবহন খাত থেকে সৈয়দপুর উপজেলায় কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। যানবাহনভেদে দৈনিক ২০ টাকা থেকে হাজার টাকা আদায় করা হয়। শহরের ২ নং রেলক্রসিং থেকে নীলফামারী সদর পর্যন্ত প্রতিদিন ২০০ ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও সিএনজি চলাচল করে। এ সড়কে প্রতিদিন ২ থেকে ৩ লাখ টাকা চাঁদা আদায় হয়। শুধু এ সড়কেই নয় উপজেলার ১ ও ২ নং রেলক্রসিং, বাস টার্মিনাল, ওয়াপদামোড়, চৌমুহনী, ঢেলাপীর সহ প্রায় ১০টি স্ট্যান্ড বা পয়েন্টে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা, বাস, পণ্যবাহী ট্রাকসহ অন্যান্য পরিবহন থেকে কোটি টাকা চাঁদাবাজি হয়। এসব পয়েন্টে ভুঁইফোড় সংগঠনের স্লিপ ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে পরিবহন শ্রমিকদের।
ইজিবাইক চালক সত্যেন কুমার জানান, প্রতিটি পয়েন্টে ঘিরে রয়েছে শ্রমিক সমিতি কিংবা মালিক সমিতির নামে-বেনামে বিভিন্ন সংগঠন। আর এগুলোর নেতৃত্বে থাকছেন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী ও প্রভাবশালীরা। এদের সমন্বয়েই গড়ে উঠেছে পরিবহন খাতের চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট। প্রতিটি পয়েন্ট বা স্ট্যান্ডেই রয়েছে সিন্ডিকেটের নিয়োগপ্রাপ্ত লাইনম্যান। সিএনজি, অটোরিকশা, বাস কিংবা ট্রাক থেকে ওই লাইনম্যানের হাতেই নির্ধারিত অঙ্কের চাঁদার টাকা আদায় হয় প্রতিদিন। বিভিন্ন রুটে গাড়ি চালাতে পুলিশকেও নির্ধারিত হারে চাঁদা দিতে হয় বলে জানান তিনি।
এ নিয়ে কথা হয় সৈয়দপুর উপজেলা পরিষদের নবনির্বাচিত ভাইস চেয়ারম্যান ও সৈয়দপুর উপজেলা অটোবাইক মালিক ও শ্রমিক সমবায় সমিতির সভাপতি মহসিন মন্ডল মিঠুর সাথে। তিনি বলেন, আমাদের সংগঠনটি সরকারি রেজিস্টারভুক্ত। আমরা আমাদের সমিতির সদস্য চালকদের কাছ থেকেই নির্ধারিত হারে অনুদান নিয়ে থাকি। সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা ও শ্রমিক কল্যাণেই এ অনুদান নেওয়া হয়ে থাকে। কোন শ্রমিক যদি দুর্ঘটনার শিকার হন কিংবা বিপদে-আপদে পড়েন তাহলে সেই অনুদানের টাকা থেকে তা ব্যয় করা হয়।
সৈয়দপুর ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক (শহর ও যানবাহন) মাহফুজার আলম বলেন, পরিবহনখাতে চাঁদা নেওয়ার বিষয়টি আমার জানা নেই। আর এর সাথে ট্রাফিক পুলিশের বিন্দুমাত্র কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।