• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৫০ অপরাহ্ন |

’আমাক বেটা আইনা দেও বাবা’- নিহত সবুজের মায়ের আকুতি

বিশেষ প্রতিনিধি।। ‘আহারে আমার পুত্র কো, আমার বেটা কো। আমাক বেটা আইনা দেও বাবা। ও বাবারে আমার বাবাক আইনা দেও। দয়াল আল্লাহ আমার বেটাক দেও গো আমার বেটাক। আমি কত দুঃখিনী মাও, আমি কত দুঃখ-কষ্ট কইরা বেটাক লেখাপড়া করাইছি। আমার বেটাক দেও গো আমার বেটাক।’ আহাজারী করে কথাগুলো বলেন কোটাবিরোধী আন্দোলনে সংঘর্ষে নিহত ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগ কর্মী সবুজ আলীর মা সূর্য বানু।

নিহত সবুজের বাড়ী নীলফামারী জেলা সদরের চওড়াবড়গাছা ইউনিয়নের বাংলা বাজার এলাকার আরাজী দলুয়া গ্রামে। বাবা আব্দুর রহিম বাদশা ভ্যানচালক এবং সূর্য বানু কাজ করেন অন্যের বাড়িতে। দুজনের সামান্য আয়ে ছেলেকে পড়াচ্ছিলেন ঢাকা কলেজে। স্বপ্ন দেখছিলেন ছেলে লেখাপড়া শিখে ধরবে সংসারের হাল। কিন্তু নিমিষেই সে স্বপ্ন নিভে গেল বাবা মায়ের।

পারিবারিক সূত্র জানায়, একমাত্র বাড়ির ভিটের আট শতক জমি ছাড়া তেমন কোন সম্পদ নেই পরিবারে। বাবার ভ্যান চালানোর আয়ে চলে তাদের পরিবার। চার ভাই এক বোনের মধ্যে সবুজ আলী তৃতীয়। সবার বড়ভাই সুজাব আলী একজন প্রতিবন্ধী। মেজভাই নূর নবী ঢাকায় পোশাক কারখানায় চাকরি করে কিছুটা যোগান দেন সংসারে। একমাত্র বোন বাছিরণ বেগমের বিয়ের হয়েছে। সবুজ আলী ঢাকা কলেজে পরিসংখ্যান বিভাগে অনার্স শেষে ভর্তি হয়েছেন মাস্টার্সে। তার ছোট ভাই শাহ সুলতান পাশ্ববর্তী পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ সরকারি কলেজে পড়েন এইচএসসিতে।

বুধবার দুপুরে জেলা শহর থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে সবুজ আলীর বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে শোকের মাতম। ছেলের শোকে মা সূর্য বানু শয্যাশায়ী। ছেলের স্মৃতিতে মুখে উচ্চারিত হচ্ছিল নানা প্রলাপ। তার বাবা আব্দুর রহিম বাদশা নেই বাড়িতে।

প্রতিবেশীরা জানান, গত দুই মাস আগে সবুজের টাকার প্রয়োজনে জীবিকা নির্বাহের একমাত্র অবলম্বনের ব্যাটারিচালিত ভ্যানটি বিক্রি করেছেন তিনি। এখন জীবন-জীবিকার তাগিদে তিনি শ্রমিকের কাজে রয়েছেন ঢাকার মানিকগঞ্জ জেলায়। সবুজের মৃত্যুর খবর বাড়িতে এলেও মোবাইল ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না তার বাবাকে।

সবুজের মা বলেন, ’আমার বাবার হ্যাতে (সাথে) কয়দিন কথা কইনা। নাতি নইয়া (মেয়ের ছেলে) একদিন কথা কইছি, আর কথা কয় নাই আমার বাবা। কালকে ফোন দিছি, হ্যার ফোন বন্ধ, দুইবার ফোন দিছি ফোন বন্ধ। রাইত দুইটার সময় মানুষ এইহানদি হাটা চলা করতাছে, একটা চেংড়া আইসা আমাক ডাক দিছে। আমার বড় বেটার নাম্বার চায়। নাম্বার চাইস ক্যা, কয় যে সবুজের কাছে কি ফোন দিছিলেন। বলি ফোনতো দিছিলাম দুইবার, ফোন বন্ধ দেহাইছে। বলি ক্যারে, সবুজের কি হইছে? তখনতো আমার মনে ডাং পইরা গেল’।

তিনি আরও বলেন, ‘আমর সবুজ বেটা যদি একদিন ফোন না ধরে, আমি পাগল হয়া যাই। এমনে আমার ওই সন্তান, আমি মাও যেইদিনেই হ্যারে মনে করি ওই দিনেই আমার বেটা ফোন দেয়। কালকা থাইকা ফোন পাইনাই, সারা রাইত ঘুমাই নাই। আমি কানতাছি আল্লার কাছে, আমার বেটা ফোন ধরলনা, কহন রাইত পোহাইবো, আমি কার কাছে যামু। কার কাছে যায়া আমার বেটার খোঁজ-খবর নিমু। হের লাইগা আল্লাহ-বিল্লা করতাছি কহন রাইত পোহাইবো। তার মধ্যে রাইত দুইটার সময় ওই মোবাইল নাম্বারের লাইগা আইছে। দুঃখ কষ্টের কথায় বলেন, ’আমার চোহে সমস্যা, হাটতে পারি না তাও সন্তানেক আমি তদবির করছি। আহারে কইলজার টুকরা, মানুষের বাড়িতে বাড়িতে কাজ কইরা খিলায়া আমি সন্তানের লেহাপড়া করাইছি গো। আমার এই সন্তানের বিচার আমি চাই, ন্যায্য বিচার আমি চাই। আমার সন্তানকে কি করলো, আমার সন্তান আমি চাই, আমার বেটা চাই। আমার সন্তান কোনদিন গ্রামে নারাই করে নাই, আমার সবুজ শান্ত’।

সবুজের ছোট ভাই শাহ সুলতান জানান, গত ১৩ জুলাই সকাল পৌনে আটটার দিকে শেষ কথা হয়েছিল পরিবারের সঙ্গে। সেদিন নিজে ফোন করে মাসহ সবার খোঁজখবর নিয়েছেন। জানিয়েছিলেন ভালো থাকার কথা।

চওড়াবড়গাছা ইউনিয়নের ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হাফিজুল ইসলাম বলেন, ‘সবুজ আলী আমার প্রতিবেশী। তার বাবা ভ্যান চালিয়ে অনেক কষ্টে ছেলের লেখাপড়ার খরচ যোগান দিচ্ছিলেন। ছেলের মাস্টার্স ভর্তির টাকার প্রয়োজনে গত দুইমাস আগে সে ভ্যানটি বিক্রি করে দেন। এরপর সংসার চালাতে দিনমজুরীর কাজে বর্তমানে রয়েছেন মানিকগঞ্জ জেলায়। ছেলের মৃত্যুর খবর দেওয়ার জন্য আমরা মোবাইলে তাকে চেষ্টা করে পাচ্ছি না’।

তিনি বলেন, ‘সবুজ শান্ত স্বভাবের। এলাকায় তাকে সকলে ভালো ছেলে হিসেবে চিনে। লেখাপড়ায় ভালো হওয়ায় বাবা মায়ের স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে সংসারের হাল ধরবে। কিন্তু সে স্বপন আর পূরণ হলো না পরিবারের’।

প্রতিবেশী অনার্স পড়ুয়া শিক্ষার্থী কাওছার আলী বলেন, ‘সবুজ আলী আমার এলাকার বড় ভাই। তিনি ২০১৮-২০১৮ শিক্ষা বর্ষে পরিসংখ্যান বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন ঢাকা কলেজে। সম্প্রতি অনার্স পর্ব শেষে মাস্টার্সে ভর্তি হয়েছেন বলে আমি জানি। কলেজের উত্তর ছাত্রাবাসের ২০৫ নম্বর কক্ষে থেকে লেখাপড়া করতেন। পাশাপাশি একটি ফটোস্ট্যাট দোকানে কাজ করতেন।’

সবুজ আলী ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের কর্মী দাবি করে নীলফামারীতে সংবাদ সম্মেলন করেছে সদর উপজেলা আওয়ামী লীগ। বুধবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে জেলা আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ে ওই সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন নীলফামারী-২ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য আসাদুজ্জামান নূর। সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয় বিএনপি-জামাত শিবিরের বর্বরোচিত হামলায় সবুজ আলী নিহত হয়েছেন।

এ সময় সংসদ সদস্য আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ‘সবুজ আলী আমাদের সন্তান। একজন দরিদ্র পরিবারের সন্তান। তার বাবা একজন ভ্যান চালক, যার ভাই ঢাকায় গার্মেন্টসের একজন শ্রমিক। সবুজ আলীকে ঘিরে ওই পরিবারের অনেক স্বপ্ন ছিল। সেই স্বপ্নটা কিন্তু এক নিমেষে নিভে গেল। একজন ছাত্রলীগের কর্মীকে কারা হত্যা করতে পারে। নিশ্চই দেশ বিরোধী শক্তি। যারা ৭১এ এই দেশের বিরোধীতা করেছে, যারা জ্বালাও পোড়াও রাজনীতি করে, অবরোধে রাজনীতি করে, হত্যার রাজনীতি করে বাংলাদেশে অরাজকতার সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছিল। যারা জঙ্গীবাদের জন্ম দিয়েছে। যে জঙ্গীবাদের শিকার সারা বাংলাদেশে নানান ঘটনা ঘটেছে। এমনকি আমাদের নীলফামারীর রামগঞ্জে যে ঘটনা ঘটেছে সেটিও সেই জঙ্গীবাদের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে’।

এসময় সাংবাদিকদের আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ‘আপনাদের কোনো মিডিয়াতে পরশুদিন এমন কোনো সংবাদ পাই নাই এখানে কোনো মৃত্যু ঘটেছে। কিন্তু আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করলাম, বাংলাদেশের মার্কিন দূতাবাস তারা ঘোষণা দিল এখানে দুইজন নিহত হয়েছেন। কি কারণে এবিষয়ে তাদের এত আগ্রহ কেন। নির্বাচনের আগেও তাদের অতিমাত্রায় আগ্রহ লক্ষ্য করেছি। এখন আবার তারা মাঠে নেমেছেন। এসব কিছুর মধ্যে একটা যোগসূত্র রয়েছে। আজকে আমাদের অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র লক্ষ্য করছি। আমরা দেশবাসীকে বলতে চাই, আসুন আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকি। আমরা সকল ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করি’। সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. আবুজার রহমান।

অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. মমতাজুল হক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আমজাদ হোসেন, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. ওয়াদুদ রহমান, পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি মসফিকুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক আরিফ হোসেন মুন, জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহিদ মাহমুদ, সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান জ্যেতির্ময় রায় খোকন ও শান্তনা চক্রবর্তী প্রমুখ।

ওই সংবাদ সম্মেলন থেকে সবুজ আলী হত্যার বিচার দাবিতে বুধবার জেলা শহরে বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

আর্কাইভ