• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:১৭ অপরাহ্ন |

মুস্তাফিজের ভূয়সী প্রশংসায় ‘দ্য গার্ডিয়ান’

মুস্তাফিজখেলাধুলা ডেস্ক: বার্নি রোনাই- ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর বিখ্যাত ক্রীড়াকলাম লেখক। তার বেশিরভাগ কলাম ফুটবল নিয়ে। ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর অনলাইনে তার জন্য আছে আলাদা একটি অংশ। যেখানে শুধু তার লেখাই পাওয়া যায়। এমন বিখ্যাত একজন বিশ্লেষক এবার লিখলেন ক্রিকেট নিয়ে।

আর সেটা বাংলাদেশি পেসার মুস্তাফিজুর রহমানের স্তুতি-কলামও বলা যেতে পারে। মুস্তাফিজের প্রতি তার প্রবল ভাললাগা ও মুগ্ধতার কথা সাবলীলভাবে তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে মুস্তাফিজের অবাক করা প্রতিভা তাকেই অবাক করেছে। বাংলাদেশি এ পেসারকে নিয়ে তার মুগ্ধতা ও প্রত্যাশা নিয়ে যা লিখেছেন তা সংক্ষিপ্ত আকরে নিচে তুলে ধরা হলো-

মুস্তাফিজুর রহমান কেমন? বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত জেলা সাতক্ষীরা থেকে উঠে আসা লাজুক, হালকা-পাতলা গড়নের বাঁ হাতি বোলার। মাত্র আট মাস হলো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার পদচারণা। কিন্তু আপনি তার পরিসংখ্যান দেখুন। দিনে দিনে তার ভক্ত সংখ্যা কিভাবে বাড়ছে সেটা দেখুন।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা দিয়ে এখন পর্যন্ত সে ৮২৪ বল করেছে। এরমধ্যে অভিষেকে টানা দুই ওয়ানডেতে ৫ ও ৪ উইকেট নেয়া। তিন ফরমেটে ১৪ গড়ে তার উইকেট ৪৩। গতমাসে ভারতীয় প্রিমিয়ার লীগে নিলামে সানরাইজার্স হায়দারাবাদ দেড় লাখ পাউন্ডে তাকে দলে ভিড়িয়েছে। টি-টোয়েন্টির স্বপ্নের এ টুর্নামেন্টে আন্তর্ভুক্তি মোটেও অবাক করা ব্যাপার নয়। তেতুলিয়ার এই ছেলেটিকে বাংলাদেশে গুগলে সবচেয়ে বেশি খোঁজা হয়।

গত বছর ভারতের অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি মুস্তাফিজের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। আমি এখন পর্যন্ত সরাসরি তার খেলা দেখিনি। টিভিতে দেখেছি। এছাড়া ইউটিউবে তার বেশ কয়েকটি সাক্ষাৎকার দেখেছি। কিন্তু কিছুই বুঝিনি। মুস্তাফিজের ভাষাটা না বুঝলেও তার আচরণ ও অঙ্গভঙ্গি বুঝি। উইকেট নেয়া ও সতীর্থদের সঙ্গে উল্লাস বৈ তার অন্য সময়ের কোনো দৃশ্য আমি দেখিনি।

এতকিছু না জেনেও নিঃসন্দেহে এখন আমার ফেভারিট আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার সে। মুস্তাফিজ খুব বেশি গতিতে বল করে না। খুব বেশি সুইং কিংবা বাউন্স দেয় না। কিন্তু তার মিডিয়ার পেসে অন্যরকম একটা মোহময়ী রহস্য আছে। একই পজিশনে বল করেও বৈচিত্র্য বোলিংয়ের অদ্ভুত ক্ষমতা তার।

বিশ্বমানের ব্যাটম্যানদের বিভ্রান্ত করার দারুণ সব অস্ত্র আছে তার ভাণ্ডারে। বোলিং স্টাইল ও শারীরিক ভারসম্যের কারণে বল ছাড়ার সময় বলে কিছু কাজ করে দেয় সে। যা যে কোনো ব্যাসম্যানের জন্য সামলানো দুরূহ। আপনি তার কাটারগুলো দেখতে পারেন। এই বলগুলো ব্যাট লাগানো মানে ব্যাটসম্যানের সাক্ষাৎ মৃত্যু।

স্রষ্টার দেয়া উপহার বাম হাতের মাধ্যমে সে বলকে ৯০ ডিগ্রি কোন থেকে নিক্ষেপ করতে পারে। সে তার ইচ্ছেমত বল বাউন্স করাতে পারে এবং গতি কমিয়ে দিতে পারে আবার ঘুরাতেও পারে। এ দক্ষতা তার নিজের তৈরি। তার এই দক্ষতার ফলে ব্যাটসম্যানরা অসহায় হয়ে তার বল ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।

এখন ভারতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া টি-২০ বিশ্বকাপের আগে সে কিছুটি ইঞ্জুরিগ্রস্ত হয়েছে। সোমবার বাংলাদেশ ক্রিকেট জানিয়েছে তাদের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক বোলার পাজরের ইঞ্জুরিতে পড়েছেন যার কারণে এশিয়া কাপের খেলা থেকে বিরত রাখাতে হয়েছে।

আমার ধারণা তারা তাকে ইচ্ছে করেই ধরে রেখেছে। এই ধারণা কোনো ভেতর থেকে পাওয়া নয় অথবা কোনো কানাঘুষাও নয়। কোনো জটিল বিষয়ও নয়। বাংলাদেশ দল চাইছে বিশ্বকাপে তাদের এই অজানা খেলোয়াড়টিকে আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ড বিশেষত নিউজিল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানদের বিপরীতে সম্মুখীন করাতে।

ভারতে হতে যাওয়া টি-২০ খুবই গুরুত্বপুর্ণ একটি সুযোগ। তাকে নিয়ে আমরা কোনো ঝুকিতে যেতে চাই না। আশা করছি সে খুব দ্রুতই সেরে উঠবে, বলেছেন বাংলাদেশের ফিজিও। আমিও চাই, এটা আমিও চাই।

আমি আবারো বলছি আমার এই মতামত সম্পূর্ণই আমার। এটা কোনো তথ্য অথবা গবেষণার ভিত্তিতে বলিনি। এটা তার কল্যাণকামীতা থেকেই চিন্তা করা। আমি চাইনা সে ইঞ্জুরিতে থাকুক অথবা স্বাভাবিক। আমি চাই সেই একজন বিশেষ কেউ হোক। সে নিজের মত করেই এমন এক মুস্তাফিজ হোক যে হবে কল্পনার সেই খেলোয়াড় যেমন খেলোয়াড়ের খেলা দেখতে নতুন করে টি-২০ খেলা শুরু করা হয়েছিল।

টি-২০তে ব্যাটিং স্ট্রাইক রেট এখন রকেটের মত। ছয় আর চার মারা হয় অসচরাচর যায়গা দিয়ে। কিন্তু এসব ছাড়াও আরো অনেক কিছু রয়েছে খেলাটিতে। বোলিং এখনো ততটাই প্রয়োজনীয় যতটা ৬০ বছর আগে ছিল। গতি, সুইং, সীম, লেগ স্পীন, অফ ব্রেক সবই আছে। অনেকে এখন দুসরা ব্যবহার করে- যা কিছুটা নতুন সংযোজন। ঠিকমত চাকিং করতেও কিন্তু চরম দক্ষতা এবং নমনীয়তা দরকার।

এটা ভাবতেও অনেক ভালো লাগছে মুস্তাফিজ ইংল্যান্ডে খেলার সুযোগ পেয়েছে। যেখানে অগতানুগতিক ও ভিন্ন আঙ্গিকের বোলাররা সাদা বলে বোলিং করলে খেলতে বিব্রত বোধ করে। বছর কয়েক আগে দুসরা বোলার মরিস হোমসকে সতর্ক এবং এক পর্যায়ে কাউন্টি ক্রিকেট থেকে বাতিল করে দেয়া হয়েছে, যেখানে ভিন্ন আঙ্গিকের বোলারদেরকে স্বাগত জানানো উচিত বলে মনে করি।

ভালো খবর হলো ইংলিশ ক্রিকেট দলে জস বাটলারের মত আংশিক  অগতানুগতিক স্পিন বোলারকে খেলতে দেখতে পাওয়া। যা নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের জন্য উৎসাহব্যঞ্জক।

এটা খুবই চমৎকার ব্যাপার হবে কারণ এই মৌসুমে সাসেক্সের হয়ে খেলার সময় আমি মুস্তাফিজকে কাছ থেকেই খেলতে দেখতে পাবো। কিন্তু তার আগে ভারতের মাটিতে বিশ্ব তার রহস্যে ঘেরা বল করা দেখতে পাবে। কোনো সন্দেহ নেই কিছু মানুষ থাকবে যারা এ ধরণের বোলিংয়ের জন্য তার সমালোচনাও করবে, কিন্তু কাটার মাস্টারের উচিত হবে তা কানে না নেয়া।

মুস্তাফিজের গুরুত্ব কতখানি তা তার উত্থানের প্রকৃতি থেকেই কিছুটা আঁচ করা যায়। চাহিদা এবং সুযোগের পরিবর্তন হতে পারে কিন্তু নতুন মাধ্যমের প্রতিভা খোঁজাকে খারাপ মনে করি না।

ক্রিকেট যদি এমন একজন টেনিস বলের ক্রিকেটারকে রাতারাতি তারকা বানিয়ে ফেলতে পারে যে কিনা তার ভাইয়ের মোটরসাইকেলে চড়ে ৩০ মাইল পথ অতিক্রম করে একটি খেলা খেলতে যায় তবে আপনি ধরে নিতে পারেন কোথাও কিছু একটা ভালো হতে যাচ্ছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ